News logo
Friday 22nd November 2019

শুটিং স্পটে নারীদেহভোগ মেয়েদের বিয়ে দিতে অভিভাবকরা সমস্যার সম্মুখীন



মার্চ ৩১, ২০১৫ | ২৩:৪৭:৪৭

গাজীপুর প্রতিনিধিঃ

গাজীপুরের বিভিন্ন শুটিং ও পিকনিক স্পট শুটিং ব্যবসার আড়ালে চলছে রমরমা অসামাজিক কার্যকলাপ। দিনের বেলা কিছু স্পটে শুটিং চললেও সন্ধ্যার পর ঢাকা থেকে আসা এক শ্রেণীর সুন্দরী তরুণীর মিলনমেলায় পরিণত হয়। সেই সঙ্গে চলে অশালীন অঙ্গভঙ্গিসহ উদ্দাম নৃত্য ও বিভিন্ন নেশাদ্রব্য সেবন, কলগার্লদের বেহায়াপনাসহ বিভিন্ন অসামাজিক আমোদফুর্তি। এসব শুটিং স্পটে টাকা হলেই আমোদফুর্তির কমতি নেই। বিভিন্ন সময় রঙ-বেরঙের পোশাক ও মেকাপে সজ্জিত হয়ে দামি গাড়িতে চড়ে আসে সুন্দরী তরুণীরা। স্পটগুলো ঘুরে জানা যায়, এখানে কম বয়সী ও সুন্দরী তরুণীদের চাহিদা অনেক বেশি। সপ্তাহব্যাপী নানা অসামাজিক কার্যকলাপের পাশাপাশি স্পটগুলোতে প্রতি বৃহস্পতি ও শুক্রবার বিকেল থেকেই চলে রমরমা জলসা।
ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিতে কষ্ট হয়
পুবাইল এলাকায় ঘুরে জানা গেছে, শুটিং স্পটের বহিরাগত দুষ্ট লোকদের অসামাজিক কর্মকাণ্ডের কারণে এখানকার স্থানীয় ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিতে অভিভাবকরা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। আশপাশ এলাকার মানুষ মনে করেন, পুবাইলের ছেলে-মেয়ে মাত্রই অসামাজিক কাজে লিপ্ত। বাস্তবে পুবাইলের মানুষ তুলনামূলকভাবে দেশের অন্যসব এলাকার চেয়ে ভালো। তারপরও এসব কলংকিত শুটিং স্পট তাদের সামাজিক ও ব্যক্তি জীবনে চরম কালিমা লেপন করছে। এসব নিয়ে পুবাইলবাসীর আক্ষেপের শেষ নেই।
ফিরোজা বেগম নামের এক মহিলা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রূপগঞ্জ থেকে আমার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল। মেয়েকে ঢাকায় আমার বড় ছেলের বাসায় দেখে পাত্রপক্ষ পছন্দ করে বিয়ের দিন-তারিখ পর্যন্ত ঠিক করে গিয়েছিল। পরবর্তীতে পাত্রপক্ষ জানতে পারে আমার মেয়ের গ্রামের বাড়ি গাজীপুরের পুবাইলে। তারপর পাত্রপক্ষ মোবাইল ফোনে জানিয়ে দিয়েছে এ বিয়ে হবে না। কেন বিয়ে হবে না, ঘটকের মাধ্যমে জানতে চাইলে পাত্রপক্ষ ঘটককে জানিয়ে দেয় পুবাইলের মেয়েরা নাকি খারাপ চরিত্রের।’ এভাবেই পুবাইল এলাকার মেয়েদের নামে এই মিথ্যা অপবাদের কারণে ক্ষোভের শেষ নেই এলাকাবাসীর।
প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে
মামলা-হামলা
স্পটগুলোকে অসামাজিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এলাকাবাসী বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ সভা, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করলেও তেমন কোনো প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি মসজিদে জনসচেতনতামূলক বয়ান, আপদ মোচনের লক্ষ্যে ‘জালালি খতম’ পড়ানো হয়। ফলে স্থানীয় অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের নিয়ে চরম আতংকের মধ্যে রয়েছেন। স্থানীয়ভাবে প্রতিরোধের চেষ্টা করা হলে তাদের ওপর নেমে আসে বিভিন্ন ধরনের মামলা, হামলা, নির্যাতন এমনকি হত্যার হুমকি পর্যন্ত। শুটিং স্পটের মালিক ও এর পরিচালনাকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় স্থানীয়রা তাদের অসামাজিক ব্যবসার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেও কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। তারপরও পুবাইল এলাকায় সামাজিক আন্দোলন বেশ সক্রিয়। আন্দোলন করতে সম্মিলিতভাবে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৪১নং ওয়ার্ডে গঠন করা হয়েছে ‘অসামাজিক কর্মকাণ্ড ও মাদক প্রতিরোধ কমিটি’। তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন ভাদুন ক্লাব ও একতা যুব সমবায় সমিতি লিমিটেড। এসব প্রতিরোধ কমিটি মাঝে মাঝে বিভিন্ন অসামাজিক কাজে লিপ্তদের হাতে নাতে ধরলেও স্থায়ীভাবে সমস্যার সমাধান করা আজও সম্ভব হয়নি। অসহায় এলাকাবাসী এ বিষয়ে আইন-শৃংখলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ চান।
অসামাজিক ব্যবসার স্পটগুলো
গাজীপুর সদর উপজেলার ভাওয়াল মির্জাপুর, পুবাইল, পিরুজালী, রাজেন্দ্রপুর, হোতাপাড়া, গজারিয়াপাড়া, পুষ্পদামসহ শতাধিক পিকনিক ও শুটিং স্পট রয়েছে। এসবের বেশির ভাগ স্পটেই চলছে অসামাজিক ব্যবসা। পুবাইলে অসামাজিক ব্যবসা চলে অনেকটা প্রকাশ্যেই। পুবাইল এলাকার বেশ কয়েকটি স্পটের বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। স্পটগুলো হচ্ছে পুবাইলের ভাদুন দরগাপাড়ার মো. হালিম সরকারের মালিকানাধীন মেঘলা পিকনিক ও শুটিং স্পট, মো. শাহিনুর রহমান ভাণ্ডারীর মালিকানাধীন শাহিন চলচ্চিত্র নির্মাণ ও বনভোজন কেন্দ্র, সরোল মন্দির এলাকায় কাজী আবদুল ওয়াহিদ পরিচালিত বিল ভেলাই শুটিং ও পিকনিক স্পট, বারইবাড়ী এলাকায় হাজী লুৎফর রহমানের মালিকানাধীন ইলু পার্ক, মো. আসাবুদ্দিন খানের মালিকানাধীন আকাশ পিকনিক ও শুটিং স্পট। অসামাজিক ব্যবসার গুরুতর অভিযোগে হাতেনাতে ধরপাড়া এলাকার নীলাচল শুটিং স্পট ও ছায়ানীড় শুটিং স্পট বন্ধ করে এখন আবাসিক বাসা ভাড়া দেয়া হয়েছে। শ্রীপুর এলাকায় রয়েছে শান্তিকুঞ্জ, মমতাজ শুটিং স্পট, সিগালসহ অন্তত ১০টি স্পট। এছাড়া জেলার কালিয়াকৈরে রয়েছে সোহাগপল্লী, আনন্দ রিসোর্ট, রাঙ্গামাটি ওয়াটার ফ্রন্ট, দিপালী, গুল বাগিচা, শিল্পীকুঞ্জসহ কয়েকটি রিসোর্ট ও শুটিং স্পট।
শিক্ষার্থী ও প্রেমিকযুগল ফিটিং
বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী প্রেমিকযুগল ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রেমিকজুটি এসব শুটিং ও পিকনিক স্পটে লুকোচুরি করে প্রেম নিবেদন এবং অসামাজিক কাজ করতে এসে পুলিশ, স্থানীয় প্রভাবশালী ফিটিংবাজদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব খুইয়ে সামাজিকভাবেও হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একটি অসাধুচক্র এসব স্পটে মোটরসাইকেলে ঘুরে ঘুরে মোটা অংকের ফিটিং বাণিজ্য করে থাকে। এই চক্রের পরিচিত কেউ আশপাশে না থাকলে তারা ছিনতাইকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আগন্তুকের টাকা-পয়সা, মোবাইল ও স্বর্ণালংকার লুটে নেয়। প্রেমিকযুগলের আপত্তিকর ছবি মোবাইলে ধারণ করে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়ার ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইলও করা হয়। ফিটিংচক্র প্রেমিকযুগলকে আটকে রেখে তাদের আত্মীয়-স্বজনকে মোবাইলে খবর দিয়ে ডেকে এনে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ারও অভিযোগও রয়েছে। এই প্রতারকচক্র প্রেমিক যুগলকে মওকামত ধরা মাত্রই চড়থাপ্পড় দিয়ে প্রথমে কাবু করে ফেলে। পরবর্তীতে চলে বিভিন্ন ধরনের আপত্তিকর ফটোসেশনের কাজ। অনেকেই সুস্থ বিনোদন বা ঘুরতে গিয়েও এসব ফিটিংবাজদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারান।
শুটিং স্পটগুলোতে যা নিষিদ্ধ
দিনের পর দিন বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকাণ্ডের কলংক মোচনের লক্ষ্যে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকার মতো পুবাইল এলাকার বাসিন্দারা বেশ সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। এলাকায় লিফলেট বিতরণ, ফেস্টুন ও মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। শুটিং স্পটের মালিকদের লিখিতভাবে অসামাজিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার জন্য মাদক প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি এবং গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ৪১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. বজলুর রহমান বাছির ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর হোসনে আরা সিদ্দিকী জুলি নোটিশ দিয়েছেন। নোটিশে এলাকাবাসীর পক্ষে উল্লেখ রয়েছে- (১) শুটিং, পিকনিক স্পট, পার্ক ও রিসোর্টের মধ্যে কোনো ধরনের অসামাজিক কর্মকাণ্ড চালানো যাবে না। (২) মাদক বিক্রি ও সেবন করা যাবে না। (৩) রাস্তাঘাট, গাছতলা, বনজঙ্গল ও ঝোপঝাড়ে ছেলেমেয়েদের অশালীনভাবে ঘোরাফেরা করা যাবে না। এসব আদেশ অমান্যকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ‘অসামাজিক কর্মকাণ্ড ও মাদক প্রতিরোধ কমিটি’র মাধ্যমে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কোটি টাকার মাদক বেচাকেনা
দেশের বড় বড় মাদক ব্যবসায়ী এখন লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন গাজীপুরের শুটিং স্পটগুলোকে। যেহেতু মাদক ব্যবসার পাশাপাশি ভালো আমোদ ফুর্তির সুব্যবস্থা রয়েছে। মাদকের বড় বড় ডিলার প্রতি মাসে এসব স্পটে কোটি কোটি টাকা লেনদেন করে। সম্প্রতি পুবাইলে মেঘলা পিকনিক ও শুটিং স্পটের পাশ থেকে ইয়াবার চালানসহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করেছে পুলিশ। এছাড়াও সন্ধ্যা হলেই এসব স্পটে বসে জমজমাট মাদক সেবন ও জুয়ার আসর।
সুসংবাদ
টঙ্গীর মাদক স্পটগুলোতে ব্যাপক অভিযান
মাদকের রাজধানী হিসেবে পরিচিত টঙ্গী। এখানে ছোট-বড় ২৩টি বস্তি রয়েছে। এসব বস্তি ঘিরে চলছে একশ্রেণীর অসাধু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা।
‘টঙ্গীর বস্তি : টাকা হলেই অস্ত্র আর মাদক’ শিরোনামে পৃষ্ঠাজুড়ে একটি অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপরই আইন-শৃংখলা বাহিনীর টনক নড়ে। সম্প্রতি টঙ্গীর বাস্তুহারা বস্তি, হাজীর মাজার বস্তি, কেরানীর টেক বস্তি, ব্যাংকের মাঠ বস্তিসহ সবকটি বস্তি ও মাদক স্পটে র‌্যাব, ডিবি ও পুলিশের বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে বেশ কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী, মাদক সেবনকারী ও সন্ত্রাসী গ্রেফতার হয়েছে। তাদের কাছ থেকে আইন-শৃংখলা বাহিনী বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করে। টঙ্গী মডেল থানা জোনের সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) মো. গোলাম সবুর জানান, পুলিশসহ র‌্যাব ও ডিবি বেশ কয়েকটি বস্তিতে অভিযান চালিয়ে অনেককে আটক করে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে।

Top