News logo
Sunday 8th December 2019

বড়লেখায় আপন ঠিকানায় ৭০ বছর পর ফিরেছেন আলী হায়দার



নভেম্বর ১৭, ২০১৫ | ১৮:৩৪:৪৯

আবদুর রব, বড়লেখা থেকে
আশি বছরের বৃদ্ধ আলী হায়দার জানতেন না তার গ্রামের বাড়ী কোথায় ? ৭০ বছর পূর্বে মাত্র ১০ বছর বয়সে ট্রেনে চড়ে নোয়াখালির চাটখিল থেকে কুলাউড়ায়। তারপর লাতুর ট্রেনে (বর্তমানে পরিত্যক্ত) ভারত হয়ে বড়লেখায় পৌঁছে চান্দগ্রামে কাটিয়েছেন জীবনের প্রায় সবটুকুই। অবশেষে ফেইসবুকের কল্যাণে সন্ধান পেলেন তার বেঁচে থাকা বোনের। সোমবার রাতে ভাগ্নের সাথে জন্ম মাটিতে ফিরেছেন জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছা সৌভাগ্যবান আলী হায়দার। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার চান্দগ্রামে ১৬ নভেম্বর মামা-ভাগনার মিলন মেলায় অনেকের চোঁখে আনন্দ অশ্র“ গড়িয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, ফেইসবুকের কল্যাণে জীবনের শেষ প্রান্তে আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা করার সুযোগ পেলেন মো. আলী হায়দার (৮০)। প্রায় ১০ বছর বয়সে বাড়ি ছেড়েছিলেন তিনি। সেই থেকে ঘর ছাড়া। প্রায় ৬ যুগ পর সোমবার মামা-ভাগনার মিলন ঘটে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার চান্দগ্রামে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৭০ বছর আগে আলী হায়দার এসেছিলেন বড়লেখা উপজেলার চান্দগ্রাম এলাকায়। তখন তাঁর বয়স ছিল ১০-১২ বছর। চান্দগ্রাম বাজারটিও এখনকার মতো ছিল না। এখানে আসার পর এলাকার অনেকের বাড়িতে গরু-মহিষ চরিয়ে জীবিকা চালাতেন। বছর তিনেক আগে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাই কাজ করতে পারতেন না। খালি জায়গায় পড়ে থাকতেন। বয়সের ভারে স্পষ্ট করে কথা বলতেও পারেন না। এ অবস্থায় চান্দগ্রামের ব্যবসায়ী সোনা মিয়া চান্দগ্রাম বাজারের একটি ফাঁকা দোকানকোঠায় তাঁর থাকার ব্যবস্থা করেন। তাঁদের বাড়ি থেকে পাঠানো হত খাবার।
জানা গেছে, নোয়াখালী জেলার চাটখিল উপজেলার জয়াগ ইউপির কুলছড়ি গ্রামের মৃত ইয়াকুব আলীর প্রথম পক্ষের দ্বিতীয় পুত্র আলী হায়দার। মা মারা গেলে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সৎ মায়ের সংসারে আপন মায়ের অভাব পুরণ হয়নি। প্রতিনিয়ত অত্যাচার নির্যাতনের কারনে আলী হায়দার ও তার বড়ভাই নাদেরুজ্জামান বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। আলী হায়দার চলে যান ভারতে। বড় ভাই নাদেরুজ্জামানের আর খোঁজ মিলেনি। ভাইরা চলে যাওয়ার পর একমাত্র ছোট বোন সাফিয়া বেগমও মামার বাড়ি চলে যান। প্রায় চার মাস ভারতে ঘোরাঘুরির পর মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার চান্দগ্রাম এলাকায় চলে আসেন আলী হায়দার।
এদিকে বড়লেখার চান্দগ্রামের সোনা মিয়ার ছেলে আখতার আহমদ বৃদ্ধ আলী হায়দারকে নিয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে ছবিসহ একটি স্ট্যাটাস দেন। এই স্ট্যাটাসের সূত্র ধরে আলী হায়দারের আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ মিলে। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার বড়লেখার চান্দগ্রামে আসেন আলী হায়দারের ছোট বোন সাফিয়া বেগমের ছেলে আব্দুর রহিম (৪৫)। মামা-ভাগনার মিলনে এলাকায় তখন এক আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমরাতো ধরেই নিয়েছিলাম মামা মারা গেছেন। আখতারের পরিবার ও ফেইইসুবকের কল্যাণে আল্লাহ তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছেন।’
সোনা মিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে একটি প্রাইভেট কার ভাড়া করে দেয়া হয়েছে। সোমবার রাতেই তাঁরা নোয়াখালীর উদ্দেশে চলে গেছেন।
ঘরহীন ঘরে ফিরতে ব্যাকুল আলী হায়দার জানান, ‘পার্টিশনের (১৯৪৭) সময় সেই যে সিলেট এসেছি আর নিজের কোন আত্মীয় স্বজনের খোঁজ পাইনি। এখন আখতারের সাহায্যে মৃত্যূর আগে নিজের গ্রামে বোনের কাছে ফিরতে পেরে খুবই আনন্দ লাগছে।’
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আলাল উদ্দিন জানান, দীর্ঘদিন ধরে আলী হায়দার চান্দগ্রামে বসবাস করছেন। তিনি নিজেও বৃদ্ধ মানুষটির ভাতার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। অবশেষে তাকে তার আত্মীয় স্বজনের কাছে
পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করায় তিনি স্থানীয় যুবক মাষ্টার্সের শিক্ষার্থী আখতারের প্রশংসা করেন।

Top