ব্রেকিং নিউজ
হাকালুকি হাওরে নির্বিচারে অতিথি পাখি নিধন

হাকালুকি হাওরে নির্বিচারে অতিথি পাখি নিধন

আব্দুর রব, বড়লেখা থেকে:
প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এশিয়ার বৃহত্তম হাকালুকি হাওরে সংঘবদ্ধ শিকারিচক্র নির্বিচারে অতিথি পাখি নিধনে তৎপর। হাওরপাড়ের প্রভাবশালী পরিবারের বিয়েতে শিকারীরা চড়া দামে অতিথি পাখি সরবরাহ করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংঘবদ্ধ শিকারি চক্রটি বিষটোপের পাশাপাশি অভিনব কৌশলে ফাঁদ পেতে অতিথি পাখি ধরায় লিপ্ত রয়েছে। সেইসাথে রয়েছে প্রভাবশালী সৌখিন শিকারিরাও। সুদূর তিব্বত, সাইবেরিয়া, চীন ও হিমাচল প্রদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শীতকালে রং বেরঙের অতিথি পাখিরা দেশের বৃহত্তম এই হাওরে অতি ঠান্ডা থেকে রক্ষা ও খাদ্যের সন্ধানে ছুটে আসে। অতীতে প্রতিবছরের নভেম্বর থেকেই ৫০ থেকে ৬০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখির আগমনে মুখরিত হয়ে উঠত হাকালুকি। বর্তমানে আগের চেনা সেই দৃশ্যপট পাল্টে গেছে।
সরেজমিন হাকালুকির বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া অঞ্চলের চকিয়া, নাগুয়া, ফুটবিল, পিংলা, চাতলা, পোয়ালা, বালিজুরি, মালাম, জলাহ, ছিনাউরাসহ কয়েকটি বিলে গিয়ে দেখা যায় শামুকখোল, পানকৌড়ী, লেঞ্জা, বক, সরালি, মাছরাঙাসহ বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির সমাগম হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিরাপদ বিচরণের অভাব ও শিকারিদের উৎপাত বৃদ্ধি পাওয়ায় গত দুই বছর ধরে পাখি কম আসছে। প্রশাসনের উদাসীনতাকেই তারা দায়ী করেছেন। বিলের পাহারাদার মতিন মিয়া, হাওরের কৃষক আবু তাহের, জালাল মিয়া, বাতান ব্যবসায়ী আব্দুল মাজেদ প্রমূখ জানান, পাখি শিকারিরা দিনে গরু-মহিষ, হাঁস চড়ানো, ধান চাষের নামে ছদ্মবেশে হাওরে ঘোরা ফেরা করে অতিথি পাখির অবস্থান নিশ্চিত হয়। পরে সুযোগ বুঝে বিষটোপের মাধ্যমে পাখি শিকার করে বস্তায় ভরে সটকে পড়ে। সন্ধ্যার পর থেকেই ১০-১২ জন সংঘবদ্ধ হয়ে পাখি শিকারে নামে। তারা জাল দিয়ে ফাঁদ পেতে পাখি শিকার করে গভীর রাত পর্যন্ত। ভোর হওয়ার আগেই হাওর থেকে চলে যায় সংঘবদ্ধ শিকারিরা। পিংলা বিলের পাশে গরু চড়াতে ব্যস্ত কিশোর শরীফ, সবুজ, সজিব জানায়, শিকারিরা পুঁটি মাছের ভিতর পটাশ ভরে বিলের পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখে। পাখিরা ওইসব মাছ খেয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেলে শিকারিরা পাখিগুলো জবাই করে নিয়ে যায়। নির্ভরযোগ্য সুত্র জানায়, হাওরপাড়ের প্রভাবশালী পরিবারের ছেলে-মেয়ের বিয়েতে অতিথি পাখি আপ্যায়ন রেওয়াজে পরিনত হয়েছে। বেশি মূল্য পাওয়ায় শিকারীরা খুচরা বিক্রির চেয়ে বিয়ের বাড়ির অর্ডার রাখতেই উৎসাহী। গত ২৯ জানুয়ারী হাওরপাড়ের তালিমপুর ইউনিয়নের এক বৌভাত অনুষ্ঠানে ১শ’ হাঁস জাতিয় অতিথি পাখি সরবরাহ করেছে জনৈক শিকারী। ২ ফেব্র“য়ারী সুজানগর ইউনিয়নের এক বিয়ে বাড়িতে ৪শ’ অতিথি পাখির অর্ডার দেয়া হয়েছে বলে সুত্র নিশ্চিত করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাওরের বনবিভাগে কর্মরত বনপ্রহরী এবং হাওরের মৎসজীবি ও কৃষিকাজে জড়িতরা জানান, সৌখিন শিকারিরা প্রায়ই ভোরে মোটর সাইকেল ও গাড়িযোগে এসে পাখি শিকার করেন। প্রভাবশালী হওয়ায় কেউই তাদেরকে বাঁধা নিষেধের সাহস দেখায় না। পর্যাপ্ত অভায়শ্রম না থাকা, নিয়মিত পাখি শিকারিদের বিরুদ্ধে অভিযান এবং হাওর উন্নয়নে নিয়োজিত বেসরকারি সংস্থা ও প্রশাসনের সমন্বয়হীনতার অভাবে শিকারিদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন হাওর তীরবর্তী এলাকার সচেতনমহল।
হাওর উন্নয়নে নিয়োজিত বেসরকারি সংস্থা ‘সিএনআরএস’ ক্রেল প্রকল্প কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমান জানান, তাদের অধীনে ৫টিসহ মোট ১২টি অভয়াশ্রম বিল রয়েছে। এবছর শিকারীদের বিরুদ্ধে কোন অভিযান হয়নি। আমরা প্রশাসনের কাছে শিকারীদের তথ্য দিয়ে থাকি। তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা আমাদের নেই। শুধুমাত্র প্রশাসনই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
এ ব্যাপারে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) প্রকাশ কান্তি চৌধুরী জানান, জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির গত সভায় হাকালুকি হাওরে অবৈধভাবে পাখি শিকারীদের তৎপরতা বন্ধের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

Share This:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*