ব্রেকিং নিউজ
শনিবার শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা

শনিবার শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা

 

কমলগঞ্জ প্রতিনিধিঃ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় পর্ব শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা মহোৎসব-২০১৫ আগামীকাল ১৭ জুলাই শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে। প্রতি বছর আষাঢ়ের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে এ রথযাত্রা শুরু হয়। আগামী ২৬ জুলাই রবিবার উল্টো রথযাত্রার মধ্য দিয়ে এ উৎসব শেষ হবে।

এ উপলক্ষে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ কেন্দ্রীয় শ্রী শ্রী দুর্গাবাড়ীতে স্থানীয় গৌরভক্ত সংঘের আয়োজনে ৯ দিনব্যাপী নানা মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আগামীকাল শনিবার ভোরে বিভিন্ন মাঙ্গলিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে শুরু হবে রথযাত্রার মূল অনুষ্ঠানমালা। কমলগঞ্জ গৌরভক্ত সংঘের সংঘাধ্যক্ষ শ্রী অবিনাশ পাল ও সচিব শ্রী ভূষন রায় জানান, ৯ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের মধ্য রয়েছে- মঙ্গল আরতি, দর্শন আরতি, মহাভোগরাগ, ধর্মীয় আলোচনা সভা, শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, হরিনাম সংকীর্তন, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আরতি কীর্তন, ভাগবত কথা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শ্রীমদ্ভাগবত গীতা পাঠ, আরতি কীর্তন প্রভৃতি।

শনিবার ভানুগাছ বাজারস্থ কমলগঞ্জ কেন্দ্রীয় দুর্গাবাড়ী প্রাঙ্গনে দুপুর ১ ঘটিকায় ধর্মীয় আলোচনা সভায় শ্রী শ্রী গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর অন্যতম পার্ষদ বাসু ঘোষের চতুর্দশ পুরুষ শ্রীযুক্ত হরিপদ ঘোষ অধিকারী প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন মাসিক শ্রী গৌরবানী সম্পাদক শ্রীযুক্ত এড: কিশোরী পদ দেব শ্যামল। আলোচনা সভা শেষে বিকাল ৪ঘটিকায় শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের বর্ণাঢ্য রথযাত্রা উৎসব-২০১৫ এর শুভ উদ্বোধন করবেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সাবেক চিফ হুইপ, মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব উপাধ্যক্ষ মো. আব্দুস শহীদ এমপি। রথযাত্রাটি কমলগঞ্জ পৌর এলাকার ভানুগাছ বাজারের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে কমলগঞ্জ কেন্দ্রীয় দুর্গাবাড়ীতে গিয়ে শেষ হবে।

এদিকে শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উপলক্ষে কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন চা বাগান সহ মাধবপুর, আদমপুর, শমশেরনগর, পতনঊষার, রহিমপুর, আলীনগর, ইসলামপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানের মঠ-মন্দিরে নয়দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। বিশেষ করে কমলগঞ্জের মণিপুরী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে রথযাত্রা উপলক্ষে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়। আয়োজন করা হয় বিশেষ অনুষ্ঠানমালার।

রথযাত্রা উপলক্ষে কমলগঞ্জ উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মধু সূদন পাল, সাধারণ সম্পাদক শ্যামল চন্দ্র দাস ও সাংগঠনিক সম্পাদক প্রনীত রঞ্জন দেবনাথ, কমলগঞ্জ উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিত্রয় নিহারেন্দু ভট্টাচার্য্য, প্রণয় দত্ত, মি. জিডিশন প্রধান সুচিয়াং, সাধারণ সম্পাদক অশোক বিজয় দেব কাজল ও সাংগঠনিক সম্পাদক জ্যোতির্ময় দেব, কমলগঞ্জ কেন্দ্রীয় দুর্গাবাড়ী পরিচালনা কমিটির সভাপতি শংকর লাল সাহা, সাধারণ সম্পাদক অমলেন্দু দেবরায় ও সাংগঠনিক সম্পাদক সুব্রত দেবরায় সঞ্জয়, কমলগঞ্জ গৌরভক্ত সংঘের সংঘাধ্যক্ষ শ্রী অবিনাশ পাল ও সচিব শ্রী ভূষন রায় ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস জগন্নাথ দেব হলেন জগতের নাথ বা অধীশ্বর। জগত হচ্ছে বিশ্ব আর নাথ হচ্ছেন ঈশ্বর। তাই জগন্নাথ হচ্ছেন জগতের ঈশ্বর। তার অনুগ্রহ পেলে মানুষের মুক্তিলাভ হয়। জীবরূপে তাকে আর জন্ম নিতে হয় না। এ বিশ্বাস থেকেই রথের ওপর জগন্নাথ দেবের প্রতিমা রেখে রথযাত্রা করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

রথের কথা:

রথ শব্দটি বলতেই আমাদের মনে ভেসে ওঠে পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রার ছবি। প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ ‘ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ’ ও ‘পদ্মপুরাণে’ও এই রথযাত্রার উল্লেখ পাওয়া যায়। পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে যে আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে রথযাত্রা অনুষ্ঠান শুরু করে শুক্লা একাদশীর দিন পূর্ণযাত্রা বা উল্টোরথ অনুষ্ঠিত হবার কথা। পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রাও প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতেই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। যদিও আষাঢ় মাসের পুষ্যানক্ষত্রযুক্ত শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতেই রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হওয়ার নিয়ম। কিন্তু প্রতি বছর তো আর পুষ্যানক্ষত্রের সঙ্গে আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথির যোগ হয় না, তাই কেবল ওই শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতেই রথযাত্রা শুরু হয়ে থাকে। তবে কখনও এই তিথির সঙ্গে পুষ্যানক্ষত্রের যোগ হলে সেটি হয় একটি বিশেষ যোগ-সম্পন্ন রথযাত্রা।
পদ্মপুরাণে উল্লেখিত রথযাত্রায় শ্রীবিষ্ণুর মূর্তিকে রথারোহণ করানোর কথা বলা হয়েছে। আর পুরীর জগন্নাথদেবের মূর্তি যে শ্রীকৃষ্ণ তথা শ্রীবিষ্ণুরই আর একটি রূপ তা সকলেই স্বীকার করেন। তবে স্কন্দপুরাণে কিন্তু প্রায় সরাসরিভাবে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার কথা রয়েছে। সেখানে ‘পুরুষোত্তম ক্ষেত্র মাহাত্ম্য’ কথাটি উল্লেখ করে মহর্ষি জৈমিনি রথের আকার, সাজসজ্জা, পরিমাপ ইত্যাদির বর্ণনা দিয়েছেন। ‘পুরুষোত্তম ক্ষেত্র’ বা ‘শ্রীক্ষেত্র’ বলতে পুরীকেই বোঝায়। অতএব দেখা যাচ্ছে যে সেই পুরাণের যুগেও এই রথযাত্রার প্রচলন ছিল।

‘উৎকলখণ্ড’ এবং ‘দেউল তোলা’ নামক ওড়িশার প্রাচীন পুঁথিতে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার ইতিহাস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে এই রথযাত্রার প্রচলন হয়েছিল প্রায় সত্যযুগে। সে সময় আজকের ওড়িশার নাম ছিল মালবদেশ। সেই মালবদেশের অবন্তীনগরী রাজ্যে ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে সূর্যবংশীয় এক পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ছিলেন, যিনি ভগবান বিষ্ণুর এই জগন্নাথরূপী মূর্তির রথযাত্রা শুরু করার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। পরবর্তিকালে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পুরীর এই জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ ও রথযাত্রার প্রচলন করেন।

বৌদ্ধযুগেও জগন্নাথদেবের রথযাত্রার অনুরূপ, রথে বুদ্ধদেবের মূর্তি স্থাপন করে রথযাত্রার প্রচলন ছিল। বিখ্যাত চিন পর্যটক ফা হিয়ান খ্রিস্টিয় পঞ্চম শতকে তৎকালীন মধ্য এশিয়ার খোটান নামক স্থানের যে বুদ্ধ রথযাত্রার বর্ণনা করেছেন তা অনেকাংশে পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফা হিয়ানের বিবরণ অনুযায়ী ত্রিশ ফুট উঁচু চার চাকার একটি রথকে বিভিন্ন রতœ, অলঙ্কার ও বস্ত্রে সুন্দরভাবে সাজানো হত। রথটির চার পাশে থাকত নানা দেবদেবীর মূর্তি। মাঝখানে স্থাপন করা হত বুদ্ধদেবের মূর্তি। এর পর সেই দেশের রাজা তাঁর মুকুট খুলে রেখে খালি পায়ে রথের সামনে এসে নতমস্তকে বুদ্ধদেবের উদ্দেশে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার পর মহাসমারোহে রথযাত্রা শুরু হত।

পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রায় আজও আমরা দেখে থাকি যে প্রতি বছর রথযাত্রার উদ্বোধন করেন সেখানকার রাজা। রাজত্ব না থাকলেও বংশ পরম্পরাক্রমে পুরীর রাজপরিবার আজও আছে। ওই রাজপরিবারের নিয়ম অনুসারে যিনি রাজা উপাধি প্রাপ্ত হন, তিনি অর্থাৎ পুরীর রাজা জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রাদেবীর পর পর তিনটি রথের সামনে এসে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান ও সোনার ঝাড়ু দিয়ে রথের সম্মুখভাগ ঝাঁট দেওয়ার পরই পুরীর রথের রশিতে টান পড়ে। শুরু হয় জগন্নাথদেবের রথযাত্রা। উদ্বোধন অনুষ্ঠানের মতোই ফা হিয়ান বর্ণিত খোটানের বুদ্ধ রথযাত্রার সময়ের হিসাব করলে দেখা যায় যে সেটি পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রার মতোই আষাঢ় মাসে অনুষ্ঠিত হত। এ ছাড়া ফা হিয়েন ভারতে এসে পাটলিপুত্র নগরীতে কুড়িটি রথের এক বিশাল বুদ্ধ-রথযাত্রা দেখবার কথাও লিপিবদ্ধ করে গেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য এই যে, জগন্নাথদেবের রূপকে যেমন বিষ্ণুরই আর একটি রূপ বলে মানা হয় তেমনই বুদ্ধদেবকেও বিষ্ণুর দশ অবতারের নবম অবতার রূপে গণ্য করা হয়। জগন্নাথ মন্দিরের গায়ে যে দশাবতারের মূর্তি খোদিত আছে সেখানেও নবম অবতাররূপে বুদ্ধদেবের মূর্তি রয়েছে।

পুরীর রথযাত্রা উৎসব হচ্ছে বড় ভাই বলরাম বা বলভদ্র ও বোন সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবন যাত্রার স্মারক। তিন জনের জন্য আলাদা আলাদা তিনটি রথ। রথযাত্রা উৎসবের মূল দর্শনীয় হল এই রথ তিনটি। প্রথমে যাত্রা শুরু করে বড় ভাই বলভদ্রের রথ। এই রথের নাম তালধ্বজ। রথটির চোদ্দোটি চাকা। উচ্চতা চুয়াল্লিশ ফুট। রথের আবরণের রঙ নীল। তারপর যাত্রা করে সুভদ্রার রথ। রথের নাম দর্পদলন। উচ্চতা প্রায় তেতাল্লিশ ফুট। এই রথের মোট বারোটি চাকা। যেহেতু রথটির ধ্বজা বা পতাকায় পদ্মচিহ্ন আঁকা রয়েছে তাই রথটিকে পদ্মধ্বজও বলা হয়ে থাকে। রথের আবরণের রঙ লাল। সবশেষে থাকে জগন্নাথদেবের রথ। রথটির নাম নন্দীঘোষ। পতাকায় কপিরাজ হনুমানের মূর্তি আঁকা রয়েছে তাই এই রথের আর একটি নাম কপিধ্বজ। রথটির উচ্চতা পঁয়তাল্লিশ ফুট। এতে ষোলোটি চাকা আছে। প্রতিটি চাকার ব্যাস সাত ফুট। রথটির আবরণের রঙ হলুদ। তিনটি রথের আবরণীর রঙ আলাদা হলেও প্রতিটি রথের উপরিভাগের রঙ লাল।

এই ভাবে রথ তিনটি সমুদ্রোপকূলবর্তী জগন্নাথ মন্দির থেকে প্রায় দু’মাইল দূরে গুণ্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। সেখানে সাত দিন থাকার পর আবার উল্টোরথ অর্থাৎ জগন্নাথ মন্দিরে ফিরে আসা। এখন তিনটি রথ ব্যবহৃত হলেও আজ থেকে সাতশো বছর আগে রথযাত্রার যাত্রাপথ দুটিভাগে বিভক্ত ছিল। আর সেই দুটি ভাগে তিনটি-তিনটি করে মোট ছটি রথ ব্যবহৃত হত। কেননা সে সময় জগন্নাথ মন্দির থেকে গুণ্ডিচা আসার পথটির মাঝখান দিয়ে বয়ে যেত এক প্রশস্ত নালা। নাম ছিল বলাগুণ্ডি নালা। তাই জগন্নাথ মন্দির থেকে তিনটি রথ বলাগুণ্ডি নালার পার পর্যন্ত এলে পরে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার মূর্তি রথ থেকে নামিয়ে নালা পার করে অপর পারে অপেক্ষমাণ অন্য তিনটি রথে বসিয়ে ফের যাত্রা শুরু হত। ১২৮২ খ্রিস্টাব্দে রাজা কেশরী নরসিংহ পুরীর রাজ্যভার গ্রহণের পর তাঁর রাজত্বকালের কোনও এক সময়ে এই বলাগুণ্ডি নালা বুজিয়ে দেন। সেই থেকে পুরীর রথযাত্রায় তিনটি রথ।

Share This:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*