ব্রেকিং নিউজ
মৌলভীবাজারে মনু ধলাই কুশিয়ারা নদের বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙণ: মানুষ বন্যাতংকে

মৌলভীবাজারে মনু ধলাই কুশিয়ারা নদের বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙণ: মানুষ বন্যাতংকে

 

এম এ মোহিত, মৌলভীবাজার
মনু ধলাই কুশিয়ারা ফানাই ও কন্টি নদ মৌলভীবাজার জেলাবাসীর জন্য দুঃখ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত এ নদগুলোর প্রতিরক্ষা বাঁধের দু’তীরের বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে বসতবাড়ি ফসলের জমি নদ গর্ভে বিলীন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ভাঙণের কবলে পড়ে গৃহহারা হচ্ছে শতশত পরিবার । বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই অব্যাহত ভাঙণে জনবসতি, ফসলের মাঠ নদ গর্ভে তলিয়ে যায়। এসব ভাঙণ রোধে বছরে কোটি কোটি টাকা বরাদ্ধ এলেও টাকার অনুপাতে মেরামত কাজ না করে লোপাট করে নিয়ে যাচ্ছে একটি সিন্ডিকেট এমন অভিযোগ ভূক্তভোগী এলাকাবাসীর। 4
জানা যায়, ধলাই নদের আলেপুর নামক স্থানে ডান তীর ভেঙ্গে প্রাথমিক বিদ্যালয় হুমকির মুখে পড়েছে। মনু নদী শরীফ ইউনিয়নের তেলিবিল ও হাজিপুর নামক স্থানে ডান তীরের জনবসতি হুমকির মুখে পড়ে পাকা ব্লক ভেঙ্গে প্রতিরক্ষা বাঁধে ধস নেমেছে। রাজনগর উপজেলার উত্তর সীমানা দিয়ে প্রবাহিত কুশিয়ারা নদীর ভাঙণে বিলীন হচ্ছে উভয় তীর । ফতেপুর ও উত্তরভাগ ইউনিয়নের বিলবাড়ি, বেড়কুড়ি, শাহনুর হাদাপুর, জাহিদপুর, আবদুল্লাহপুর, কান্দিগাও, নলুয়ারমুখ বাজার (কালারবাজার), সদর উপজেলার মনুমুখ, ফাজিলপুর, বাহাদুরপুর, দাউদপুর, কাটাগঞ্জবাজার, হামেরকোনা, ব্রাহ্মণগ্রাম, শেরপুর বাজারের নদীতীরের নৌবন্দর এলাকা ও নতুনবস্তি ভাঙণের মুখে পড়ে শেরপুর বাজারসহ বাড়িঘর, দোকানপাট মসজিদ-মন্দির ও ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। দুই তিন দিনের টানা বর্ষণে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে দুক’ল ভাসিয়ে ফসলের মাঠসহ জনবসতি লন্ডভন্ড করে দেয়। শুরু হয় বসতবাড়ি,গবাদিপশু ও জমির ফসল হারা মানুষের আর্তনাদ। নদীগুলোর অন্তত ৫০টি স্থান অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ভারত সীমান্ত শরীফপুর ও হাজিপুর এলাকা ব্যাপক ভাঙণের কবলে পড়ে মৌলভীবাজারের মানচিত্র পাল্টে যাচ্ছে। জেলাবাসীর মধ্যে বন্যা আতংক বিরাজ করেছে। খরস্রোতা মনু নদীর বাঁধ ভেঙে বাড়িঘর, রাস্তা ঘাট ও ফসলের মাঠ লন্ডভন্ড হয়ে যায়। মহাপরিকল্পনা নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণের স্থায়ী কোন ব্যবস্থা গ্রহন না করায় বন্যা আক্রান্ত জেলাবাসী হতাশ হয়ে পড়েন। মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, মনুনদীর কুলাউড়া, রাজনগর ও মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আলীনগর, রণচাপ, জালালপুর, পালপুর, মূর্তিকোনা, খাসপ্রেমনগর, আদিমাবাদ, আশ্রয়গ্রাম, কোনাগাও কটারকোনা, কান্দিরকূল, হাসিমপুর ছাড়াও শুধু কুলাউড়া উপজেলার ১৮টি গ্রামের ভূ-খন্ড নদী গর্ভে বিলীন হওয়ার পথে। এসব গ্রাম গুলোর মধ্যে পৃথিমপাশা ইউনিয়নের আলীনগর, সাইলকা, গজভাগ, রাজাপুর, কালিরকোনা, সুজাপুর, টিলাগাও ইউনিয়নের চাঁনপুর, আশ্রয়গ্রাম, ইসবপুর, জালালপুর, সন্দ্রাবাজ ও হাজিপুর ইউনিয়নের রণচাপ, চক রণচাপ,হাজিপুর, মাহতাবপুর, মনুবাজার, কাউকাপন। শরীফপুর ইউনিয়ন অফিস ভবনের অস্তিত্ব ভাঙণের হুমকির মুখে রয়েছে। মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণে সংশি¬ষ্ট কতৃপক্ষের সঠিক পরিকল্পনা না থাকায় মনু পাড়ের মানুষের বন্যা আতংক ও দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে। কুলাউড়ার পৃথিমপাশা , শরীফপুর ও হাজিপুর ইউনিয়নের কয়েক শত বাড়িঘর নদী গর্ভে বিলীন হতে চলছে। ২০০৪ সালের ভয়াবহ বন্যার পর মেরামত কাজে অনিয়মের অভিযোগ করে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারক লিপি সহকারে অভিযোগ দিলেও কোন তদন্ত করা হয়নি বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন। বন্যা মোকাবেলায় দীর্ঘ মেয়াদী কোন পরিকল্পনা না নিয়ে স্থরে স্থরে উন্নয়ন ও প্রতিরক্ষা বাঁধ সংস্কার করায় বন্যায় আক্রান্ত হতে হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে টার্গেট অনুযায়ি প্রতি বছর ৫০০ মিটার বাঁধে উন্নয়ন কাজ না হয়ে ১০০ মিটার কাজ হচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনার অভাব ও স্বজনপ্রীতি এবং বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ঠিকাদারদের প্রভাবে কতৃপক্ষ তাদের ইচ্ছামত নকশা প্রণয়ন করতে পারে না। এতে করে প্রয়োজন নেই এমন সব জায়গায় বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করতে হয় বলে বহু অভিযোগ রয়েছে। মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান বিগত অর্থ বছরে এ জেলায় ৬৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ওই প্রকল্পের অধীনে পর্যায়ক্রমে তা তিন বছরে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় । এসব প্রকল্পের মধ্যে ১৭০ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থান ৪ থেকে ৫ ফুট উঁচু এবং চওড়া বৃদ্ধি করা হয়। যেসব স্থানে বাঁধ ভেঙ্গে সংকুচিত হয়ে প্রসস্থতা কমে গেছে সে সব জায়গায় জমি অধিগ্রহণ করে বাঁধের পরিধি বাড়ানো হয়। মনু নদীর যে সব স্থানে বাঁক ভাঙণের কবলে রয়েছে সেসব স্থানে পাথর ফেলে মজবুত করা হয়,যাতে ওই এলাকার বাড়িঘর বিলীন হয়ে না যায়। মৌলভীবাজার শহরের বড়হাট এলাকা থেকে শেরপুর পর্যন্ত বাম তীরের ঝুঁকিপূর্ণ স্থনে অবস্থা ভেদে ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার ‘কোর ওয়াল’ বা বন্যা প্রতিরক্ষা পাকা দেয়াল নির্মাণ করা এবং শহর প্রতিরক্ষা বাঁধ হচ্ছে। দু’পাড়ের প্রতিরক্ষা বাঁধ উঁচু হলে নদীতে স্রোত বেড়ে যাবে কয়েকগুণ তখন উজান থেকে আসা পলি বালি আটকিয়ে নাব্যতা হ্রাসের আশংকাও অনেক খানি কমে যাবে। কুশিয়ারা নদীর ভাঙণ তীব্র আকার ধারণ করায় নদী তীরবর্তী অন্তত অর্ধশত গ্রাম হুমকির মুখে পড়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকে ভাঙণের তীব্রতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে বলে এলাকাবাসী জানান। রাজনগর উপজেলার উত্তর সীমানা দিয়ে প্রবাহিত কুশিয়ারা নদীর ভঙণে বিলীন হতে চলছে ফতেপুর ও উত্তরভাগ ইউনিয়নের নদীতীরের জনবসতি ও ফসলের মাঠ। নদীতীরের গ্রামের বাসিন্দা উমর আলী, ফাতির মিয়া,আশিক মিয়া, খলিল মিয়া ও ফাহিম মিয়াসহ এলাকার বহু নারী পুরুষ আলাপ কালে এ প্রতিবেদককে জানান, রাজনগর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের বিলবাড়ি, বেড়কুড়ি, শাহনুর হাদাপুর, জাহিদপুর, আবদুল¬াহপুর, কাশিমপুর, ইসলামপুর, কালারবাজারের উত্তরাংশ, মোকামবাজার, কান্দিগাও, নলুয়ারমুখ বাজার(কালারবাজার), সদর উপজেলার মনুমুখ, ফাজিলপুর, বাহাদুরপুর, দাউদপুর, কাটাগঞ্জবাজার ও হামেরকোনা, ব্রাহ্মণগ্রাম, শেরপুর বাজারের নদীতীরের নৌঘাট এলাকার ও নতুনবস্তি ভাঙণের মুখে পড়ে শেরপুর বাজারসহ এ এলাকার অনেক বাড়িঘর, দোকানপাট মসজিদ মন্দির ও ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। কুশিয়ারা নদীর ডানতীরের সুনামপুর, উম্মরপুর, খাসগাও ও বকশিপুরসহ বিশাল এলাকা জুড়ে নদী ভাঙণের তান্ডব শুরু হয়েছে বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে পাল¬া দিয়ে। লোকজন অভিযোগ করে আরও বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্বাবধানে এসব এলাকায় পাকা ব¬ক নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিলেও নির্ধারিত মেয়াদ অতিক্রম করার পরও ভাঙণ কবলিত এলাকায় ব্লক বসানো হয়নি। মাঝে মধ্যে যা কিছু ব্লক বসানো হয়েছে তাতেও পুকুর চুরির ঘটনা ঘটেছে। নিম্ন মানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি ব্লক গুলো স্থানান্তরের সময় ভেঙে যায়। এতে হাজার হাজার ব্লক তৈরির পর নদী তীরে পরিত্যাক্ত অবস্থা পড়ে রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুপারেন্টেনডেন্ট ধীরেন্দ্র নাথ এ প্রতিবেদককে বলেন (২৪ জুলাই) রোববার দুপুরে পুরাতন প্রজেক্টের মেরামত ও আনুসঙ্গিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্খ বরাদ্ধ চেয়ে চেয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বছরের শুরুতেই কিন্তু চাহিদা অনুযায়ি বরাদ্ধ এখনও আসেনি।

Share This:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*