ব্রেকিং নিউজ
মহিষের উন্নয়নে সুষম খাবার

মহিষের উন্নয়নে সুষম খাবার

বাংলাকাগজটুয়েন্টিফোরডটকম স্পোর্টস ডেক্সঃ মহিষের উন্নয়নে সুষম খাবার, ভ্যাক্সিনেশন আর কৃত্রিম প্রজনন-এই তিনটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চারণভূমি সৃষ্টির মাধ্যমে মহিষের পর্যাপ্ত সুষম খাবারের নিশ্চয়তা, কৃষকের সচেতনতা আর প্রজননকেন্দ্র গড়ে তুলতে পারলে মহিষ পালনে চরাঞ্চলের অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। শহরভিত্তিক শিল্প সমৃদ্ধির দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে দক্ষ ব্যবস্থাপনায় উপযুক্ত পরিচর্যা করা গেলে চরাঞ্চলেও দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্যপণ্য উত্পাদনের অপার সম্ভাবনার কথা বলছেন পেশায় নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তা, প্রাণী বিশেষজ্ঞ আর কৃষকরা। এরই মধ্যে বাউফলের কয়েকটি চরের কৃষকরা মহিষের দুধ উত্পাদনে সচেতন হচ্ছেন। পাশের ভোলা জেলার চরাঞ্চল থেকে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া মহিষের বাচ্চা এনে লালন-পালন শুরু করেছেন।

আমন উঠে গেলে তেঁতুলিয়ার বুকচিরে জেগে ওঠা বাউফলের বিভিন্ন চর দাবরে বেড়ায় কালো-ধূসর মহিষের পাল। চরভূমে জন্মানো হাইচা, পারা, বোগরা, হোয়াজালি, খরমা, এলি, ব্যাঙের খাঁচা, কচুরিপানা এসব ঘাসই এখানের মহিষের খাবার। মহিষগুলো পালে পালে খাবার খেয়ে পানিতে গাঁ ডুবায় তেঁতুলিয়ার কূলে। দিনের শেষে একসঙ্গে মিশে যায় বাতামে (একই সঙ্গে অনেক মহিষ) এসে। আবার চাষ মৌসুমে চরের কাদামাটি গায়ে মেখে লাঙলের ফলা ঘুরায় কৃষকের জমিনে। ফসল মৌসুমে লাঙল টেনে কোনোমতে বেঁচে আছে কেবল স্থানীয় জাতের অনুন্নত কাঁচা ঘাসনির্ভর এই মহিষগুলো বিভিন্ন চরে। তবে দিনে দিনে মহিষের মাংসের চাহিদা বৃদ্ধি ও দুধের দাম বেশি থাকার কারণে মহিষের জাত উন্নয়ন ও মহিষ পালনে ঝুঁকছেন কৃষকরা।

রায়সাহেবচরে মহিষের পালের সঙ্গে থাকা ভরিপাশা গ্রামের কৃষক আলমগীর হোসেন গাজী জানান, মহিষের দুধের দাম বেড়ে গেছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর মহিষের দুধের দাম ২০ শতাংশ বেড়েছে। সারা বছর মহিষের দুধের দাম গরুর দুধের চেয়ে লিটারপ্রতি কমপক্ষে ১০ টাকা বেশি থাকে। দিন দিন মহিষের মাংসের চাহিদাও বেড়ে চলছে। পর্যাপ্ত ঘাসের ব্যবস্থা করলে মহিষের স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। দুধ উত্পাদন বাড়বে। চরাঞ্চলের কৃষকরা লাভবান হবেন।

একটি হলিস্টিন বা জার্সি জাতের গরু থেকে যে পরিমাণ দুধ পাওয়া যায় নিতান্ত অবহেলায় পালিত একটি মহিষ থেকে তার কাছাকাছি দুধ পাওয়া সম্ভব। কিন্তু এখানে যা পাওয়া যায় অনায়াসে। দুধ বিক্রেতা (ঘোসা বা গোয়ালা হিসেবে পরিচিত) রায়সাহেবচর ও চরমিয়াজানের শহিদুল, জালাল খলিফা, ফিরোজ, আকবর, খোকন, উজ্জ্বল, হানিফ বেপারী, জলিল দালাল, শিপন, খোকন মৃধা, খালেক পণ্ডিত ও মানিক গাজী জানান, মাত্র দুই থেকে আঁড়াই লিটার দুধ পাওয়া যায় একটি গাভী মহিষ থেকে। সনাতন পদ্ধতিতে হাতে বাঁট (মহিষের দুধ) টেনে বাঁশের চোঙে দুধ বের করায় পরিপূর্ণ মাত্রায় দুধ পাওয়া সম্ভব হয় না। এরপরও প্রতিদিন রায়সাহেব ও তার পাশের চরমিয়াজান, চরওয়াডেল, মমিনপুর, চরকচুয়া, নিমদীচরসহ কয়েকটি চরে প্রায় ৭০-৮০ মণ দুধ উত্পাদন হয়। বাউফলের চাহিদা পূরণ করে প্রতিদিন পাশের জেলা ভোলা, বাকেরগঞ্জ, পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন উপজেলায়ও পাঠানো হয় দুধ।

মহিষের কৃত্রিম প্রজননের বাধা হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেন দুর্গম চর থেকে নির্দিষ্ট সময় গরম হওয়া মহিষ প্রজনন কেন্দ্রে নিয়ে আসার কষ্টসাধ্য ব্যাপারটিকে। তবে মহিষের উন্নয়নে ঠিকমতো খাবার, ভ্যাক্সিনেশন আর কৃত্রিম প্রজনন-এই তিনটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, মহিষের উন্নয়নে সচেতন হওয়া দরকার। দরকার চারণভূমির।

পটুয়াখালী সরকারি কলেজের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক (অব.) পীযূষ কান্তি হরি বলেন, দিন দিন মহিষ পালনে কৃষক আগ্রহ হারাচ্ছেন। সবার আগে প্রজননকেন্দ্র স্থাপন করে সেখানে এনে দেশি মহিষগুলোকে রক্ষা করতে হবে। মহিষের জন্য যে পরিমাণ ঘাস লাগে তা বাসাবাড়িতে উত্পাদন করা সম্ভব নয়। মহিষ রক্ষায় প্রজননকেন্দ্র আর মহিষ পালনকেন্দ্র করতে হবে। তেঁতুলিয়ার তীরে হাজার হাজার একর জমি পড়ে আছে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের আওতায় এনে মহিষের চারণভূমি তৈরি করতে হবে। বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী অঞ্চলের মহিষগুলো প্রায় একই ধরনের পরিবেশে বসবাস করে। জোয়ারের পানিতে দু’বার ৪-৮ ঘণ্টা পানিতে থাকতে হয়। উন্নত মানের বাথানের ব্যবস্থা করতে পারলে মহিষগুলো ভালো থাকবে।

জলোচ্ছ্বাসে বা জোয়ারের পানিতে ভেসে যাবে না। জেগে ওঠা চরের জমি বনবিভাগের আওতায় দিয়ে দেওয়া সরকারের অলিখিত নিয়ম আছে। প্রাণিসম্পদ অধিদফতরকে চরের খাসজমি দেওয়া গেলে কেল্লা, উন্নত বাথান ও চারণভূমি তৈরির মাধ্যমে মহিষ পালনে আগ্রহ তৈরি হবে। মহিষের প্রোডাক্টিভিটি বাড়বে, প্রোডাকশন বাড়বে, স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। তবে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সুষম খাবার, কৃত্রিম প্রজনন, চারণভূমি তৈরিসহ মিল্কভিটা, আড়ং কিংবা ডানোর মতো বিশ্বমানের দুধ ও দুগ্ধজাত প্রক্রিয়াকরণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে চরের অর্থনীতির চাকাও ঘুরে যেতে পারে কৃষকের ক্ষেতে মহিষের লাঙ্গলের ফলা ঘুরানোর মতো। বাউফলের তেঁতুলিয়ার বুকে জেগে ওঠা রায়সাহেব চরের মতো জেগে উঠবে মহিষ উন্নয়নের মাধ্যমে দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্যপণ্যের উত্পাদন সম্ভাবনার স্বপ্নরাজ্য।

Share This:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*