ব্রেকিং নিউজ
ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত। পহেলা ফাল্গুন আজ

ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত। পহেলা ফাল্গুন আজ

বাংলাকাগজটুয়েন্টিফোরডটকম, ডেক্সঃ ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত। পহেলা ফাল্গুন আজ। তুমি আসবে তাই শিমুল গাছটি রাঙা ফুলে ছেয়ে গেছে। বিকালের সোনালি আভায় দিগন্তজুড়ে সোনালি রঙ ধারণ করেছে। শিমুল-পলাশ-কৃষ্ণচূড়ার বনে লেগেছে আগুন। তবে এবারের বসন্তে শুধু কৃষ্ণচূড়ার বনেই আগুন লাগেনি, লেগেছে গোটা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। শঙ্কা, অনিশ্চয়তা, সহিংসতায় পুড়ছে দেশ। ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতেও লেগেছে অশুভ রাজনৈতিক আগুন। শত বাধা-বিপদের মধ্যেও অন্যরকম এক ভালোবাসা আর ভালোলাগার অনুভূতি নিয়ে হাজির হয়েছে রঙিন বসন্ত।
প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে মিলেমিশে আজ একাকার হওয়ার উৎসব। বসন্তের হাওয়া আর পুষ্পের রঙ রাঙিয়ে দেবে কোটি বাঙালির মন। বসন্তের অপার্থিব মুগ্ধতার ঘোরে হৃদয় নাচবে আপন সুরে, আপন খেয়ালে। এজন্যই বসন্তবাতাসে পুলকিত ভাটিবাংলার লোককবি শাহ আবদুল করিম গেয়েছেন_ ‘বসন্ত-বাতাসে সই গো/বসন্ত বাতাসে/বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে…’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘রঙ লাগালে বনে বনে।/ঢেউ জাগালে সমীরণে/আজ ভুবনের দুয়ার খোলা দোল দিয়েছে বনের দোলা্ত।’ এ কেবল কবিগুরুর ভাষাতেই নয়, বাস্তবেও ফাগুন হাওয়ার দোলা লেগেছে বাংলার নিসর্গে। ফাল্গুন-চৈত্রের সম্মিলনে গাছে গাছে নতুন পাতার সঙ্গে বাগানে বাগানে ফুটেছে নানা রঙের ফুল। আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।/তব অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে/করো না বিড়ম্বিত তারে।’ বিড়ম্বিত নয়, আমরা উদার আহ্বান জানাই ফুল ফোটা আর কোকিল ডাকার এই আনন্দময় ঋতুটিকে। বলি, ‘আয়রে বসন্ত, ও তোর কিরণমাখা পাখা মেলে।’
শীতের হাত ধরে আসে বসন্ত। অনেকে বলে থাকেন, শীত হল বসন্তের অগ্রদূত। শীতের হিমেল হাওয়া, কুয়াশার চাদর মুড়ি দেওয়া সময় যখন ফুরোয়, জয়ের মালা গেঁথে আগমন ঘটে বসন্তের। দখিন হাওয়ার নরম কবোষ্ণ হাওয়া আমাদের মনকে উন্মন করে তোলে। আমাদের বাউল কবি যখন বলেন, ‘বসন্ত বাতাসে সই গো বসন্ত বাতাসে, বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে।’ বসন্তের অনিবার্য অনুষঙ্গ ফুল আর ফুলের সুবাস বেয়েআসা স্মৃতি-গন্ধ-খুলে দেয় সুপ্ত মনের জানালাগুলো। খোলা জানালা মানে, হাওয়াদের আনন্দ হিল্লোল, আনন্দ হিল্লোল মানে দূরাগত কোনো ফুলের সুবাস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রকৃতি নিয়ে অনেক গান রচনা করেছেন। বেশি লিখেছেন বসন্ত নিয়ে। বসন্ত ঋতুর মধ্যে কবি ঐশ্বর্য, রূপময়তা যেমন দেখেছেন, দেখেছেন প্রাণ জাগিয়ে তোলার আনন্দধ্বনি। তাই তার উদাত্ত আহবান-এস’ এস’ বসন্ত, ধরাতলে।/আন’ মুহুর্মুহু নব তান, আন’ নব প্রাণের নব গান।/আন’ গন্ধমদভরে, অলস সমীরণ।/আন’ বিশ্বের অন্তরে আনন্দছন্দের চেতনা/আন’ নব উল্লাস হিল্লোল।/আন’ আন’ আনন্দছন্দের হিন্দোলা ধরাতল।/ভাঙ’ ভাঙ’ বন্ধনশৃঙ্খল।’ বসন্ত শুধু ঢের আনন্দের বারতাই বয়ে আনে না, শৃঙ্খল ভাঙার মন্ত্রও শুনিয়ে যায় বাতাসের চরণধ্বনিতে। বসন্ত শুধু ফোটা ফুলের মেলা নয়, ঝরা পাতার ঔদাস্যভরা মর্মর ধ্বনিও।
নগরজীবনে ষড়্ঋতুর আগমন আর বিদায়ের বার্তা তেমন একটা অনুভব করা যায় না। বাগান কেটে আমরা কংক্রিটের জঞ্জাল বানাতে পারদর্শী। নানা অছিলায় নগরকে বৃক্ষশূন্য করে ফেলছি। বাগান নেই তো পুষ্প নেই, বৃক্ষ নেই তো কোকিল নেই। তা হলে কী করে শুনব বসন্তের নরম নিক্বণ! তারপরও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বসন্ত বরণ হয়, চলে বসন্তের নানা রঙিন উত্সব। ঢাকার রমনা ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পয়লা বসন্তে ঝলমলে রঙিন হয়ে ওঠে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের হলুদ পোশাক আর পুষ্প আভরণে পরিবেশ-প্রকৃতিও উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। সব মিলিয়ে, আমাদের প্রার্থনা-‘দখিন-হাওয়া জাগো জাগো, জাগাও আমার সুপ্ত এ প্রাণ।’
তাই ষড়ঋতুর এই দেশে বসন্তকে ঋতুরাজ উপাধি দেয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন হিম-কুয়াশায় ঢাকা শীতের পর রুক্ষ মৃতপ্রায় নিসর্গে উষ্ণতার স্পর্শ দিয়ে জীবনের স্পন্দন ফিরিয়ে আনে বসন্ত। তাই বসন্ত মানেই সুন্দরের উদ্ভাসন, আর জীবনের জয়গান। ভালোবাসা আর নবযৌবনেরও প্রতীক এ ঋতু। তাই যাপিত জীবনের সব দুঃখ-কষ্টের মাঝেও বাঙালি বরণ করে নিচ্ছে বসন্তকে।
ডিজিটাল এ যুগে বসন্তের বার্তা ছড়িয়েছে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন সাইটে। এসব সাইটে বসন্ত নিয়ে নানা মন্তব্য আর মনের গহিন আবেগ প্রকাশ করেছে বসন্তপ্রেমীরা। অনেকেই তাদের প্রোফাইলে যোগ করেছেন বসন্তের ফুল। ফেসবুকে ফুল মিললেও ইটপাথরের যান্ত্রিক এ নগরে দীর্ঘ হরতাল-অবরোধের মধ্যে বসন্তের ফুল খুঁজে পাওয়া একটু কঠিনই বটে। তবে তাতে কিছু যায় আসে না। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘ফুল ফুটুক আর না-ই ফুটুক, আজ বসন্ত।’ ব্যস্ত এ নগরে হয়তো কাজের চাপে কেউ কেউ ভুলে যেতে পারেন বসন্তের কথা; তবে তরুণ-তরুণীদের মনে গুঞ্জরিত হচ্ছে ভালো লাগার গান, ভালোবাসার গান। বাসন্তি রঙের শাড়ি পরে, খোঁপায় গাঁদা-গোলাপসহ বসন্তের ফুলে সেজে তরুণীরা শাহবাগ, চারুকলা চত্বর, টিএসসি, পাবলিক লাইব্রেরি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ বিভিন্ন স্থানে মেতে উঠবেন। বসন্তের প্রথম দিনে অনেকে কর্মস্থলেও আসেন বাসন্তি সাজে। ফাগুনের শুরুতেই হয়তো কেউ কেউ প্রকৃতির শোভা দেখতে বেরিয়ে পড়েন আনন্দ ভ্রমণে। কিন্তু ইট-কাঠের এ নগরে সবুজ আর প্রকৃতির দেখা মেলা ভার। তবে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান, রমনা উদ্যান, বলধা গার্ডেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বনানী ও ধানমন্ডি লেকের পাড়, মিন্টো রোড, হেয়ার রোড, চারুকলার পেছনের সবুজ প্রাঙ্গণে নিসর্গের সানি্নধ্য পাওয়া যায়। কানে বেজে উঠতে পারে ঋতুরাজের নকিব কোকিলের সুমধুর কুহু স্বর। এ ফাগুন কেবল প্রকৃতির কথাই মনে করিয়ে দেয় না; আমাদের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের শহীদদের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। বায়ান্নর ৮ ফাল্গুন তথা একুশের শিমুল-পলাশরাঙা দিনে তারুণ্যের সাহসী প্রত্যয় আর বাঁধভাঙা আবেগ সেদিন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। বসন্তকে বরণ করতে রাজধানীজুড়ে থাকছে নানা কর্মসূচি। পহেলা ফাল্গুনে বসন্ত উৎসব উদযাপনের জন্য দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করছে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলায় সকাল ৭টা থেকে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া বাহাদুরশাহ পার্কে বিকাল সাড়ে ৪টায়, ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবরে ৪টায় ও উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরে উন্মুক্ত মঞ্চে সাড়ে ৪টা থেকে বসন্তের অনুষ্ঠান শুরু হবে।

Share This:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*