ব্রেকিং নিউজ
চৈত্রের অকাল বৃষ্টিতে মৌলভীবাজারের হাওরের ৩৫০ হেক্টর বোরো ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে

চৈত্রের অকাল বৃষ্টিতে মৌলভীবাজারের হাওরের ৩৫০ হেক্টর বোরো ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে

এম এ মোহিত: গত ক’দিনের টানা ভারি বর্ষণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে ভারি বৃষ্টিপাতের পানি উজান থেকে বিভিন্ন ছাড়া দিয়ে হাওরে প্রবেশ করায় জেলার হাকালুকি,কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওরসহ বিভিন্ন হাওরের নিচু এলাকার প্রায় ৩৫০ হেক্টর বোরো ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টি এবং পাহাড়ী ঢলের কারনে মৌলভীবাজার বিভিন্ন হাওরসহ নি¤œাঞ্চলে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সারা জেলায় ৩৫০ হেক্টর জমির বোরো ধান পানির নীচে তলিয়ে গেছে। এ দিকে নদীর পানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে ২/৩ দিন এই অবস্থা থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে। এ দিকে মনু সেচ প্রকল্পের ৬ টি সেচ পাম্প বিদ্যুৎ থাকা সাপেক্ষে সচল থাকলেও হাওরের কৃষকদের আশা জাগাতে পারছে না। ফলে ফসল হারানোর আশংকা করছেন কৃষকরা।
মৌলভীবাজারে বৃষ্টি এবং উপর থেকে গড়িয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার হাওর কাউয়াদিঘি, হাইল হাওর, হাকালুকি হাওরের নি¤œাঞ্চলে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজনগর, কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, বড়লেখা, মৌলভীবাজার সদর ও জুড়ি উপজেলার প্রায় ৩০৫ হেক্টর পাকা বোরো ধান পানির নীচে তলিয়ে গেছে। রাজনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শেখ আব্দুল আজিজ জানিয়েছেন হাওর কাউয়াদিঘি পাড়ের সাদাপুর, আব্দুল্লাহপুর, মুজেফরপুরসহ কয়েকটি এলাকার পাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কিন্তু হাওর কাউয়াদিঘি এলাকার বোরো ফসলসহ অকাল বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য স্থাপিত মনু সেচ প্রকল্পের কাশেমপুর পাম্প হাউসের ৮ টি পাম্পের মধ্যে হাওরের পানি বের করে দেয়ার জন্য ৬ টি পাম্প সচল থাকার কথা পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থানীয় অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) শামছুল হক জানালেও স্থানীয় কৃষকরা দাবী করেছেন হাওরেরর পানি সময় সময় বাড়ছে। ফলে কৃষকদের মধ্যে ফসল হানির আশংকা বাড়ছে। তা ছাড়া জানাগেছে পাম্প হাউস এলাকায় প্রায় সময় পরিমানমত ভোল্টেজ না থাকায় সব পাম্প এক সাথে চালু করা যায় না। উপর থেকে হাওরে নেমে আসা পানি ও পাম্প দিয়ে বের করে দেয়া পানির মধ্যে পার্থক্য বিস্তর থাকে। ফলে কৃষকরা ফসল হানির আশংকায় সময় কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ আধাপাকা ধান কেটে তুলার চেষ্টা করছেন। রাজনগর উপজেলার পাঁচগাও ইউনিয়নের রক্তা গ্রামের কৃষক তজমুল আলী জানিয়েছে বোরো ধান এখনো পাকার বাকি আছে ৭/৮ দিন যে হারে পানি বাড়ছে মনে হচ্ছে সব তলিয়ে যাবে। তার দাবী পাম্প সঠিকভাবে চালু রাখার। একই এলাকার আরেক কৃষক অভিযোগ করেন পাম্প সব সময় সচল রাখা হয় না। কিন্তু কাগজ পত্রে দেখানো হয় ঠিকই। তার যুক্তি তা যদি সচল রাখা হতো তবে প্রতিবছর এই হাওরের কৃষকরা ফসল হারাতো না।পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও আবাসিক এলাকার বাড়িঘর রাস্তাঘাট। ডুবে গেছে শত শত পুকুরসহ হাজার হাজার একর ফসলী জমি। চৈত্র মাসের এ অসময়ে বন্যার আগমন দেখে হতবম্ব হয়ে পড়েছেন স্থানীয় লোকজন। অনেকেরই চুলায় পানি উঠায় সকাল থেকে রান্না হয়নি। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে অভূক্ত রয়েছেন। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় বের হতে পারছেন না ঘর থেকে। রোববার রাত থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিল। রাতের খাবার খেয়ে সবাই বেশ আরামেই ঘুমিয়ে ছিলেন। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে অনেকের চোখ কপালে উঠে যায়। ৩ ঘরের জিনিসপত্র ভাসতে হতবাক সবাই। চৈত্র মাসে যেখানে মানুষ পানির জন্য হাহাকার পড়ে যায়। সেখানে পানিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় অবাক হয়েছেন এলাকাবাসী। তবে এর জন্য এলাকাবাসী দোষারোপ করছেন নদী ও বৃষ্টির পানি হাওড়ে নামার পথে অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণ এবং পাহাড়ি ছড়ার পাড় দখলকে।এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ভানু লাল রায় জানান, ২শ’ বছরের ইতিহাসে তাদের বাড়িতে এই প্রথম পানি উঠলো। তাও আবার চৈত্র মাসে। সবুজবাগ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা রজত শুভ্র চক্রবর্ত্তী, উত্তম দেব নাথ ও রাজীব আলী জানান, চৈত্র মাসে বাড়িঘরে এভাবে পানি উঠতে তারা আগে দেখেননি। পানির স্রোতে এলাকার ২০টি স্থানে নদীরপাড় ও চলাচলের রাস্তা সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে বলেও জানান তারা। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নুরুল হুদা জানান, বিভিন্ন এলাকায় বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির সংবাদ তার কাছে এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো চিহ্নিত করে তাদের সাহায্য দেয়া হবে। কমলগঞ্জ উপজেলায় ৭০ হেক্টর জমির উঠতি বোরো ফসল ও ৫ হেক্টর জমির সব্জি তলিয়ে গেছে। ভারী বর্ষণের সাথে সৃষ্ট মাঝারি ঝড়ে গাছ পড়ে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাহাড়ি এলাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙ্গে, তার ছিড়ে বৈদ্যুতিক লাইনের ক্ষতি সাধন হয়েছে। নদী ও পাহাড়ি ছড়ার পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রোববার (৩ এপ্রিল) সারা দিন থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও সারা রাতের ভারী বৃষ্টিতে পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে ও সীমান্তভর্তি ইসলামপুর ইউনিয়নের আন্ডর ড্যাম্প-এর বাঁধ ভেঙ্গে প্লাবনের পানিতে ইসলামপুর, আদমপুর, আলীনগর, মাধবপুর ও কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ব্যাপক এলাকার উঠিতি বোরো ফসল তলিয়ে গেছে। সাথে সাথে ৫ হেক্টর জমির তরমুজ, ঢেঁড়শসহ বিভিন্ন জাতের সব্জি তলিয়ে গেছে। সোমবার সকাল থেকে কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাঠ পর্যায়ে ঘুরে ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করতে দেখা গেছে। কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: শামছুদ্দীন আহমদ বলেন ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢলের পানিতে ৭০ হেক্টর জমির উঠতি বোরো ফসল ও ৫ হেক্টর জমির সব্জি তলিয়ে গেছে। দ্রুত পানি নেমে গেলে বোরো ও সব্জির তেমন ক্ষতি হবে না বলেও কৃষি কর্মকর্তা জানান। কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, ভারী বৃষ্টিতে ইসলামপুর ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকার আন্ডু নামের ড্যাম্পের বাঁধ ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা পানিতেই বেশী ক্ষতি করেছে বোরো ক্ষেতের। রোববার রাতের ভারী বৃষ্টির সাথে মাঝারি ঝড়ে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাহাড়ি এলাকায় গাছ পড়ে একটি বৈদুতিক খুঁটি ভেঙ্গে গেছে। ৮টি স্থানে তার ছিড়ে ও বেশ কিছু ইন্সুলেটর ভেঙ্গে বৈদ্যুতিক ক্ষতি সাধন হয়েছে। সোমবার বোর থেকে বিদ্যুৎ কর্মীরা পাহাড়ি এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত স্থান মেরামত করে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তাছাড়া রোববার রাত সাড়ে ৩ টার বজ্রপাতে মাধবপুর ইউনিয়নের টিলাগাঁও গ্রামে একটি গরু মারা গেছে ও এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। এদিকে ,ধলাই ও লাঘাটা নদী এলাকায় দেখা যায়, উজান থেকে নেমে আসা ভারতীয় পাহাড়ি ঢলের পানিতে নদীতে পানি বেড়ে বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তাছাড়া সবগুলো ছড়ার পানিও বেড়ে গেছে। কমলগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা মো: আসাদুজ্জামান বলেন, ইউনিয়ন ওয়ারি ক্ষয়ক্ষতির তথ্য চেয়ে তারা ৯টি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে ফোন করেছেন। তারা এখন কোন তথ্য উপজেলা প্রশাসনে প্রদান করেননি। মৌলভীবাজার খামারবাড়ি কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ শাহাজান বুধবার বিকালে মুঠোফোনে জানিয়েছেন জেলার মোট ৩৫০হেক্টর বুরো ধানের জমি পানির নিচে তলিয়েগেছে। তিনি আরো জানান এভাবে পানি বৃদ্ধি পেলে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমান আরো বাড়বে। এদিকে মনুনদীর পানি বিদসীমার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) ফয়জুর রব।

Share This:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*