ব্রেকিং নিউজ
লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল:গাছচোরদের আধুনিক অস্ত্র আর বন কর্মকর্তাদের লাঠিসোটা

লাউয়াছড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল:গাছচোরদের আধুনিক অস্ত্র আর বন কর্মকর্তাদের লাঠিসোটা

বিপন্ন লাউয়াছড়ার আর্তনাদ-১

এম এ মোহিত, লাউয়াছড়া থেকে ফিরেঃ
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের সবুজ নিসর্গ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সংরক্ষিত বনাঞ্চল 1থেকে প্রতিদিন দাপটের সঙ্গে নির্বিচারের গাছ কেটে নিচ্ছে সংঘবদ্ধ গাছ চোর চক্র। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী একাধিক নেতার নাম ভাঙ্গিয়ে সশস্ত্র গাছচোর চক্রের সদস্যরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ব্যবস্থাপনা কমিটি ও বন বিভাগ অসহায় বলে গাছচুরি রোধে তেমন কোন ভূমিকা রাখতে পারছে না।

গাছচোর ঠেকাতে অসহায় বন কর্মকর্তাঃ
লাউয়াছাড়া জাতীয় উদ্যান অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। গাছচোরদের হাতে আধুনিক অস্ত্র আর বন কর্মকর্তাদের কাছে লাঠিসোটা থাকায় অসহায় হয়ে পড়েছেন সরকারি দায়িত্ব পালনকারিরা। এই জাতীয় উদ্যানকে রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য যে জনবল প্রয়োজন তা পর্যাপ্ত না থাকার কারণে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা স্বিাকার করলেন দায়িত্বরত বন বিট2 কর্মকর্তা মোঃ রেজাউল করিম ১২ জানুয়ারি মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে পরিদর্শন কালে কথা হয় বাংলাকাগজটুয়েন্টিফোরডটকম-এর সঙ্গে। ওই কর্মকর্তা বলেন প্রায় ৭ বর্গ কিলোমিটার গভীর বনজঙ্গল এলাকা পাহারা বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৫জন স্টাফ থাকার কথা থাকলেও সেখানে মাত্র ৬জন পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এই বনাঞ্চলের পূর্ব-পশ্চিমে আয়তন প্রায় ৭-৮ কিলোমিটার এবং উত্তর-দক্ষিণে ৫-৬ কিলোমিটার রয়েছে। তাছাড়া সরকার কর্তৃক বন কর্মকর্তাদেরকে সরবরাহকৃত বিভিন্ন ধরণের অস্ত্র (বন্দুক) থাকলেও এগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই মান্দাতার আমলের। এসব অস্ত্র সয়ংক্রিয় থাকার কথা থাকলেও বেশির ভাগই অকেজো বলে জানালের লাউয়াছাড়া বনের বিট কর্মকর্তা মোঃ রেজাউল করিম এবং তার সহকারি মোঃ শফিকুর রহমান সরকার।3 তারা আরও বলেন, অস্ত্র গুলোর মধ্যে বেশির ভাগ অকেজো হয়ে পড়েছে। তাই তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এতে লাঠিসোটা নিয়ে জীবণের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়। তারা বলেন, তাদের অস্ত্র গুলো অকেজো থাকায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অপর দিকে গাছচোর বা বনদস্যদের হাতে থাকে অত্যধুনিক অস্ত্র তাই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অনেক সময় গাছচোরদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে উল্টো তাদের হাতে নাজেহাল হতে হয় বন বিভাগের লোকজনকে।
সরেজমিন অনুসন্ধাকালে একাধিক সূত্রে জানা যায়,কমলগঞ্জ উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কাঠ 4পাচারকে ব্যবসা এবং পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছেন সংঘবদ্ধ কাঠ চোর চক্র। কাঠ চোর চক্রের শতাধিক সদস্য এই বনাঞ্চলের কাঠ পাচারের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল ও ব্যবসায়ীদের ছত্রছায়ায় এক শ্রেনীর অসাধু বন কর্মকর্তার সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে বন রক্ষকরা ভ ক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ন হয়েছে। প্রতিনিয়তই নির্বিঘেœ এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। দরিদ্র পরিবারের কিছু সংথ্যক বেকার যুবকদের ব্যবহার করে অতিরিক্ত মজুরী দিয়ে মূল্যবান গাছ কেটে ফায়দা নিচ্ছে প্রভাবশালীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বনে বসবাসরত লোকজন গাছচোর চক্রের সদস্যরা সবাই থাকে বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিত। আর হাতে গুনা মাত্র কয়েকজন বনকর্মীরা লাঠি হাতে বন রক্ষার দায়িত্ব পালন করে। গাছচোর চক্রের সদস্যদের চুরি প্রতিরোধে কেউ এগিয়ে আসলে তার প্রাণনাশের সম্ভাবনা থাকে বেশী। মাঝে মাঝে গাছচোর চক্র বনকর্মীদের ওপরও হামলে পড়ে। ১২৫০ হেক্টর আয়তনের এ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। বিশাল এ এলাকার গভীর বনের মাঝে মাত্র ৬/৭ agor gachজন বন কর্মী গাছ গাছালি রক্ষার জন্য পাহারা দিতে দেখা যায়। তার বিপরীতে সংঘবদ্ধ সশস্র গাছ চোর সদস্যদের সংখ্যা কয়েক গুন বেশি। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের গাছ চোর চক্রের সাথে থাকে ভাল ও উন্নত প্রযুক্তি মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক,পুলিশ ও বন বিভাগের কতিপয় কর্মীর সাথে সুসম্পর্ক থাকায় কোন বিপদ আসার পূর্বেই তারা সতর্ক হয়ে যায়। ভিআইপ বা বনবিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা লাউয়াছড়া বন বিশ্রামাগারে অবস্থানের সময় ওই এলাকায় কড়া পুলিশি নিরাপত্তা থাকে। কিন্তু এর ফাঁকে রাতের দিকে সংঘবদ্ধ গাছচোর চক্র লাউয়াছড়া বন বিশ্রামাগারের খুব কাছ থেকে সেগুনসহ বড়বড় গাছ কেটে নিয়ে যায়। গত বছরের ১২ ও ১৩ এপ্রিল লাউয়াছড়া থেকে এক রাতে এক সাথে ১৯ টি বিশালাকৃতির সেগুণ গাছ কেটে ফেলে গাছচোর চক্র।5 ২২ এপ্রিল বিভাগীয় বন কর্মকর্তা লাউয়াছড়ায় অবস্থানকালীন সময়েও ৪ টি সেগুণ গাছ কেটে নেয় চক্রটি। একই বছর ২৫ এপ্রিল রাত ৯ টার দিকে লাউয়াছড়া ও জানকি ছড়ার মধ্যবর্তী স্থানে সড়কের পাশ থেকে বিশাল আকারের একটি সেগুণ গাছ কেটে নেয় গাছ চাের চক্র। এ ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে জয়নাল আবেদীন নামের এক বনকর্মীর বিরুদ্ধে পর দিন বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তার প্রতিবেদন কি দেয়া হয়েছে তা প্রকাশ করা হয়নি। জানা যায়,বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কাঠ পাচার কিছুটা হ্রাস পেলেও সম্প্রতি এ বনের গাছ পাচার মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বনাঞ্চল এলাকার কাঠ পাচারকারী দলের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সরকার দলীয় স্থানীয় কতিপয় নেতা কর্মী এ কাজে জড়িত বলে কাঠ পাচারে তাদের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা গ্রহন করতে পারছে না। সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে শুধু বন থেকে যারা কাঠ কেটে নিয়ে আসে তাদের মধ্যে কমলগঞ্জের ১৫০ জনের একটি দল ৩/৪টি গ্র“পে বিভক্ত হয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর বনে অবস্থান করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বনাঞ্চল এলাকার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজনৈতিক 1ছত্রছায়ায় রাজকান্দি রেঞ্জের কয়েকটি বিটে ও শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের কাঠ পাচারকারীরা প্রতিদিন সন্ধ্যার পরেই ট্রাক ও পিকআপ নিয়ে বনাঞ্চলে প্রবেশ করে সেগুন, চাপালিশ ও আকাশমনিসহ মূল্যবান বিভিন্ন প্রজাতির গাছ কেটে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। সংখ্যায় তাদের দল অনেক বড়। কাঠ পাচারে তারা এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। রাজকান্দি রেঞ্জের রেঞ্জার বর্তমান কর্মস্থলে যোগদানের পর থেকে এ অঞ্চলের বিট গুলো থেকে কাঠ পাচার সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন। লাউয়াছড়া রেঞ্জের উর্ধ্বতন বন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও কাঠ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। জীববৈচিত্র রক্ষা সহায়তাকারী সংগঠন সমম্বিত রক্ষিত সূত্রে জানা যায়, কতিপয় বন কর্মকর্তা ও কর্মচারি কাঠ পাচারে জড়িয়ে পড়ায় সম্প্রতি কাঠ পাচারকারী দল এতোই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তাতে যারা কাঠ পাচার রোধে কাজ করছে তারা অসহায় হয়ে পড়েছে। গাছ চুরির সাথে লাউয়াছড়া সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির টহলদলের কতিপয় সদস্য জড়িত রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে। Pic-kamalgongলাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন বালিগাঁও,কান্দিগাঁও, রাজটিলা, বাঘমারা, কুমড়া কাপন,ভেড়াছড়া, ছাতকছড়া, ফুলবাড়ি,সরইবাড়ি, বটতল, লঙ্গুর পারসহ কয়েকটি গ্রামের সংঘবদ্ধ গাছচোর চক্র প্রতি রাতে দাপটের সাথে গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। বন বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এত কম লোক বল দিয়ে সঠিকভাবে বন পাহারা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তাছাড়া গাছচোর চক্র অনেকটা হিংস্র প্রকৃতির। তাদের প্রতিহত করতে বনকর্মীরা জীবন বাজি রেখেও দায়িত্ব পালন করছে। Pic-Kamalgonj-Boles-150x150গাছচোর চক্রের সাথে বন কর্মীর জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন ওই কর্মকর্তা। তবে বন বিভাগের লোকজন গাছ চুরির সঙ্গে জড়িত প্রমাণ পেলে তদন্ত পূর্বক বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার হবে বলে জানান।
তবে আলাপকালে কমলগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের এক নেতা বলেন,গাছচোরদের কোন দল নেই। বিপদে পড়লে তারা দলের আশ্রয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন কতিপয় অসাধু বনকর্মী গাছচোর চক্রের সাথে জড়িত থাকতে পারে। আর যদি তার দলের কেহ সংঘবদ্ধ গাছচোর চক্রের সাথে জড়িত থাকে তা হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Share This:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*