ব্রেকিং নিউজ
কমলগঞ্জের ছয়ছিড়ি দিঘীর পাড়ে চড়ক পূজা ও মেলা

কমলগঞ্জের ছয়ছিড়ি দিঘীর পাড়ে চড়ক পূজা ও মেলা

আব্দুর রাজ্জাক রাজা ,কমলগঞ্জ থেকে :
কমলগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ঐতিহ্যবাহী চড়ক পূজা ও মেলা শুরু হয়েছে। গত মঙ্গলবার( ১২ এপ্রিল) দিবাগত গভীর রাত থেকে ঐতিহ্যবাহী ছয়ছিড়ি দিঘীর পারে এ চরম পূজা ও মেলার ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় শুরু হয়। দুইশত বছরের ঐতিহ্যবাহী চড়ক পূজা ও মেলাকে কেন্দ্র করে কমলগঞ্জের ছয়চিরিসহ আশেপাশের এলাকার মানুষের মধ্যে বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। ২ দিনব্যাপী এ চড়ক পূজা ও মেলা শেষ হবে পহেলা বৈশাখ বৃহস্পতিবার। প্রায় ২শ বছরের অধিক সময় ধরে প্রাচীন ঐতিহ্য লালিত রহিমপুর ইউনিয়নের ছয়ছিড়ি দিঘীর পাড়ে বাংলা পুঞ্জিকা মতে প্রতিবছরের চৈত্র সংক্রান্তিতে ২দিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে চড়ক পূজা উৎসব। জানা যায়, চড়ক পূজা উৎসবের ১০/১২ দিন পূর্ব থেকে বিভিন্ন এলাকার সনাতনী হিন্দু ধর্মের নি¤œ বর্ণ শব্দকর সম্প্রদায়ের পূজারীর মধ্যে ৪০/৫০ জন সন্ন্যাস ধর্মে দীক্ষিত হয়ে গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিব-গৌরী সহ নৃত্যগীত সহকারে ভিক্ষাবৃত্তিতে অংশ নেন। এ ক’দিন তারা পবিত্রতার সহিত সন্যাস ব্রত পালন করে নিরামিষ ভোজি এবং সারাদিন উপবাস পালন করেন। চড়ক পূজার ২ দিন পূর্বে পূজারীরা শ্মশানে গিয়ে পূজা অর্চনা করেন ও শেষে গৌরীর বিয়ে, গৌরী নাচ ও বিভিন্ন গান গেয়ে ঢাকের বাজনায় সরগরম করে গোটা এলাকা। ছয়ছিড়ি দিঘীর পাড়ে ভক্তরা নৃত্য করার জন্য কলাগাছ ও বাঁশের খুটি বেষ্টিত মন্ডলী তৈরী করে। পূজার প্রথম দিন মঙ্গলবার নিশি রাতে তান্ত্রিক মন্ত্র ধারা কাচ পড়া দিয়ে জলন্ত ছাইয়ের (অঙ্গারের) উপর মানুষরুপি কালী সেজে নৃত্য করে। ভক্তগণ নৃত্যের তালে তালে, ছন্দে ছন্দে ঢোলক, কাশি, করতাল বাজান। এসময় দর্শনার্থীরা জয়ধ্বনি এবং নারীদের কন্ঠে হুলুদ ধ্বনি দেওয়া হয়। জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে এই ‘কালীনাচ’ অত্যন্ত আকর্ষনীয় এবং তান্ত্রিক মন্ত্র দিয়ে ৭টি বলিছেদ (লম্বা দা) এর উপর শিব শয্যা করেন। শিবের উপর উঠে কালী ভয়ানক এক অদ্ভুত রুপ ধারন করেন। এ দৃশ্যে উপস্থিত দর্শনার্থী সবাই আতঙ্কিত হয়ে উঠেন। কালীকাঁচ শেষ হওয়ার পর সকালে পূজারীরা পূজা করে পান বাটা দিয়ে চড়ক গাছকে নিমন্ত্রণ জানিয়ে ঐতিহাসিক ছয়ছিড়ি দিঘী থেকে ভেসে উঠে ১০০ ফুট লম্বা চড়ক গাছ। এ গাছের চুড়া থেকে মাচা পর্যন্ত চারটি পাখার মতো করে বাধা হয় চারটি মোটা বাঁশ এবং তাতে যুক্ত করা হয় মোটা মজবুদ লম্বা রঁশি। আগের বছর উৎসব শেষে এই দিঘীতে ডুবিয়ে রাখা হয়ে ছিল চড়ক গাছ। দিঘীর পাড়ে গর্ত খুড়ে সোজা এবং খাড়া করে পোঁতা হয় এ গাছ। বুধবার দুপুর থেকে নারী পুরুষ দর্শনার্থীর বিশাল সমাগম ঘটে চরক পূজা ও মেলা স্থলে । বিকেল বেলা ভক্তরা মন্ডলীতে বিশাল দা (বলিছেদ) দিয়ে নৃত্য, শিবের নৃত্য ও কালীর নৃত্য পরিবেশন করেন। নৃত্য শেষে ঐতিহাসিক ছয়ছিড়ি দিঘীতে স্নান করে ভক্তদেরকে লোহার শিকল (কাটা) শরীরের বিভিন্ন অংশে গাঁথা হয়। বিশেষ করে জিহ্নবা ও গলায় গেঁথে দেয়া হয়। নৃত্যের তালে তালে চড়ক গাছ ঘুরানো হয়। দেবতার পূজা-অর্চনা শেষে অপরাহ্নে মূল সন্ন্যাসী ৪ জন ভক্তের (জ্যান্ত মানুষের) পিঠে লোহার দু’টি করে বিরাট আকৃতির বড়শি গেঁথে রঁশিতে বেঁধে ঝুলিয়ে চড়ক গাছ ঘুরানো হয়। এ সময়ে দর্শনার্থীদের অনেকে হরিলুট হিসাবে বাতাসা আর কলা উপরের দিকে উড়িয়ে দেন আর দর্শনার্থীরা তা কুড়িয়ে নেন।
(আজ ১৪ এপ্রিল) বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে ফেরা চড়ক পূজা। ওই দিন দেবতার পূজা অর্চনা করা হবে। ঐতিহ্যবাহী ছয়চিরি দিঘীর চার পাড়ের মধ্যে দিঘীর পূর্বপাড়ে ১টি, উত্তর পাড়ে ১টি এবং দক্ষিন পাড়ে ২টি চড়ক গাছ স্থাপন করে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। আর এ কঠিন ধর্মীয় উৎসবটি উদযাপন করেন একমাত্র শব্দকর সম্প্রদায়ের লোকজন। বাকী সনাতনী হিন্দু সম্প্রদায় পূজা হিসাবে অংশ গ্রহন করে থাকেন। তান্ত্রিক মন্ত্রের ধারা বিভিন্ন অলৌকিক ধর্মীয় কর্মসূচী উপভোগ করার জন্য প্রতি বছরের মত এবারও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানথেকে হাজার হাজার নারী-পুরুষ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে দর্শনার্থীর সমাগম হবে। চড়ক পূজা উপলক্ষে এক বিশাল মেলা বসেছে।

Share This:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*