ব্রেকিং নিউজ
একাত্তরের পরাজিতরাই ’৭৫-এর খুনি: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

একাত্তরের পরাজিতরাই ’৭৫-এর খুনি: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

বাংলাকাগজটুয়েন্টিফোরডটকম ডেস্ক:

’৭৫-এর খুনি আর একাত্তরে পরাজিত শক্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ’৭৫-এর পর নানা ধরনের অপপ্রচার করে মানুষের মনকে বিষাক্ত করা হয়েছিল। অনেক সময় এমন মনে হতো, দেশ স্বাধীন করা একটা মহা অপরাধ হয়ে গেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, একটা শোষিত জাতির মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম করে গেলেন সারাটা জীবন। আপনারা একটু হিসাব করে দেখেন, কতগুলো বছর একটানা জেলে ছিলেন তিনি। কষ্ট করে দেশটা স্বাধীন করলেন। মাত্র সাড়ে তিন বছর তিনি সময় পেয়েছিলেন, সেই সময়েও তো অনেকে সহযোগিতা করেননি। এমন একটা পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল, যা ’৭৫-এর পটভূমি তৈরি করে দিয়েছিল। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছেছিল ’৭৫-এর হত্যাকাণ্ডের পর আবার ঘাতকের দেশ হিসেবে পরিচিতি পেল।

শুক্রবার রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট আয়োজিত বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ উপলক্ষে এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, আমার সোনার বাংলা গানটি যে জাতীয় সঙ্গীত করবেন এই সিদ্ধান্তও কিন্তু বহু আগে নেয়া ছিল। ‘জয় বাংলা স্লোগান’ মাঠে নেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছিল ছাত্রলীগকে। কিন্তু এরপর যখন নির্বাচন হল, ৭ ডিসেম্বর শক্তিশালী নির্বাচন হল। জানুয়ারি গেল ফেব্র“য়ারি গেল। কিন্তু ক্ষমতা তারা দিল না। বঙ্গবন্ধু জানতেন যুদ্ধ অবধারিত। একটা যুদ্ধ করতে গেলে তার প্রস্তুতি লাগে। লন্ডনে বসে তখনই তিনি যুদ্ধ করতে গেলে ট্রেনিং কোথায় হবে? অস্ত্র কোথা থেকে আসবে? শরণার্থী গেলে তাদের থাকার ব্যবস্থা কী হবে। সেসব পরিকল্পনা তিনি করে এসেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিন্তু তিনি (বঙ্গবন্ধু) সবসময় তার বক্তৃতা এমনভাবে রাখতেন যে পশ্চিমারা এতটুকু সন্দেহ করতে না পারে, ধরতে না পারে তিনি করতে যাচ্ছেন। এটাই একজন রাজনৈতিক নেতার দূরদর্শিতা। আমাদের কোনো কোনো নেতা তো বলেই ফেলেছেন, ভোটের বাক্সে লাথি মারো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো। ভোটের বাক্সে লাথি মেরে কখনও কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন করা যেত না। কেউ কেউ আসলামু আলাইকুম বলে পাকিস্তানকে বিদায় করেছেন। কিন্তু পাকিস্তান বিদায় হয়নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু জানতেন কী করতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন মানুষ মাত্র ৫৪ বছর বেঁচেছিলেন। এই সময়ে তিনি দুইটা স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন। কিন্তু ’৭৫-এর পরে তার এই ভাষণও বাজাতে দেয়া হতো না। এই ভাষণ বাজাতে গিয়ে ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের কত নেতাকর্মী হত্যা-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একটা সময় বঙ্গবন্ধুর নাম নেয়াটাই যেন নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। অনেক ছবির মাঝে বঙ্গবন্ধুর ছবিটা লুকিয়ে রাখতে হতো। কিন্তু কেন? তার অপরাধ কী ছিল? তার অপরাধ ছিল ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর শোষণের হাত থেকে একটা জাতির স্বাধীনতা এনে দেয়া। আসলে পাকিস্তানি হানাদার আর তাদের দোসর বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিল না।

৭ মার্চের ভাষণের পটভূমি তুলে ধরে তিনি বলেন, ’৬২ সাল থেকেই একেবারে মহকুমা ও থানা পর্যায় পর্যন্ত ছাত্রলীগের মাধ্যমে তিন সদস্যবিশিষ্ট নিউক্লিয়াস গঠন করে তিনি প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। যখন রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল তখনও তিনি এটা করেছিলেন। মূল ভাষণ মূলত ছিল ২৩ মিনিটের। আমি ওই মাঠে উপস্থিত ছিলাম। রেকর্ড করা হয়েছিল, ১৮-১৯ মিনিটের। সেই ভাষণে ২৩ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস, সবকিছু বিবৃত করে ভবিষ্যতে কী করতে হবে, একটা গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি কিভাবে নিতে হবে, সেটা তিনি তার ভাষণে বলে গিয়েছিলেন। অসহযোগ আন্দোলন, পহেলা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ মনে হয়েছিল বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একাট্টা হয়ে গিয়েছিল।

তিনি বলেন, মঞ্চ দেখলেও বুঝবেন, তেমন কোনো প্রস্তুতি ছিল না। একটা উচু মঞ্চ আর একটা মাইক। এই ভাষণের জন্য আমাদের অনেক জ্ঞানীগুণী নেতা কেউ চিরকুট দিচ্ছেন, কেউ বলে যাচ্ছেন, নেতা এটা করতে হবে, এটা বলতে হবে। এখানে আমি বলব, সব থেকে বড় অবদান মায়ের। আমার মা কিন্তু জনসম্মুখে আসেননি।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে তার কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ৭ মার্চের ভাষণের আগে বাবা বের হবেন। আমার মা বলেছিলেন, অনেকে অনেক কিছু বলে দিয়েছে, লিখে দিয়েছে, কিন্তু তুমি জানো কী বলতে হবে। তুমি জানো, একমাত্র তুমি জানো তোমার মনে ঠিক যে কথাগুলো আসবে তুমি ঠিক সেই কথাগুলোই বলবে। আমার মনে আছে, তিনি কথা শুনে হাসলেন, তারপর মাঠের দিকে রওনা করলেন। পিছন পিছন আমি রেহানা আরেকটা গাড়িতে গেলাম।

ভাষণ শেষ করে তিনি যখন এলেন, তখন মানুষে মানুষে সয়লাব ছিল এলাকা। আমি যখন ঘরের মধ্যে ঢুকলাম, ঠিক সেই সময় দেখি, আমাদের কতজন ছাত্রনেতা হঠাৎ বেশ উত্তেজিত। তারা বলছেন, লিডার এটা কী করলেন আপনি, স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে এলেন, সবাই খুব হতাশ। আমি তখন বললাম, আপনারা এরকম মিথ্যা কথা বলেন কেন। আমি মানুষের মধ্যে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে এলাম, সেখানে কিন্তু কোনো হতাশা দেখিনি। আমি বললাম, আব্বা আপনি এদের কথা বিশ্বাস করবেন না। আমি নিজে দেখে এলাম, মানুষ স্লোগান দিতে দিতে উৎফুল্ল হয়ে পড়েছে শহরে। আমি এখন মনে করি, তারা ওই কথা কেন বলেছিল, এটা নিয়ে এখন চিন্তা করার আছে। তাহলে তারা কাদের হয়ে ওই কথা বলেছিল। কারণ বঙ্গবন্ধু তো জানতে কিভাবে মানুষের মুক্তি আসবে।

অনুষ্ঠানে আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, আমার একটা আকাঙ্ক্ষা আমাদের নতুন প্রজন্মের যারা ইতিহাস বিকৃতির সময় বেড়ে উঠেছে, তাদের মনের  আকাঙ্ক্ষা কী? আজকের মূল প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে তা জানা হল। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, তত দিন বাঙালির হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু থাকবে।

Share This:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*