ব্রেকিং নিউজ
আজ ৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার মুক্ত দিবস: থাকছে নানা কর্মসূচি

আজ ৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার মুক্ত দিবস: থাকছে নানা কর্মসূচি

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি : ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার শত্র“মুক্ত হয়ে যায়। মুক্ত নি:শ্বাস ফেলে, মুক্ত ভূমিতে মৌলভীবাজার জেলার বাসিন্দারা ফিরে আসেন। তবে এই মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিল মৌলভীবাজারবাসী ২৭ মার্চেই এক সশস্ত্র প্রতিরোধের মধ্যদিয়ে। আওয়ামীলীগ,ন্যাপ,ছাত্রলীগ ও ছাত্রইউনিয়ন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এই সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামে। ২৭ মার্চ সকাল ১০টার দিকে মৌলভীবাজার শহরের পশ্চিমাঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ শহরের শত্র“রব্যুহ তছনছ করতে ছুটে আসে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শাহবন্দর এলাকার শ্রীরাইনগরে তারা পাক শত্র“র মুখোমুখি হন। এখানে পঞ্জাবী সেনার গুলিতে শাহবন্দরের তারা মিয়া এবং রাধানগর গ্রামের জমির মিয়া এই দুই কুষক শহীদ হন। জেলায় পাকহানাদারের হাতে তারাই প্রথম শহীদ। অপরদিকে একই দিন শহরের উত্তরাঞ্চল থেকে অনুরোপ একটি মিছিল শহরের দিকে ছুটে আসলে চাঁদনীঘাট সেতুর কাছে পাক হানাদার বাহিনী মিছিলটিকে প্রতিরোধ করে। সেখানে পাক সৈন্যের গুলিতে গুজারাই গ্রামের লুন্দু মিয়া এবং আরো ৬জন নাম না জানা ইটভাটা শ্রমিক শহীদ হন। অন্যপ্রতিরোধটি আসে ২৮ মার্চ শমসেরনগর এলাকায় চাতলাপুর বিওপি থেকে। বিওপির ইপিআর অফিসার জওয়ানরা বিদ্রোহ করেন। সেখানে তাদের সাথে মুক্তিযোদ্ধা ও হাজার হাজার মানুষ এসে মিলিত হয়। জনতা ট্রেনের ওয়াগন ফেলে রাস্তায় ব্যরিকেড সৃষ্টি করে। জওয়ানরা অবস্থান নেয় আমান উল্লা ও উস্তার মিয়ার দালানের ছাদে। বিকেল ৪টার দিকে ১০তম পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ৩টি গাড়ি বোঝাই হয়ে আসা পাক সেনারা ব্যরিকেড ভাঙ্গার চেষ্টা করলে ইপিআর সদস্য আমির হোসেন ও আবুল কালাম পাক সৈন্যদের ওপর গুলি ছুড়ে। ঘটনাস্থলেই পাকবাহিনীর একজন মেজর নিহত হয়। এতে পাকসেনারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। জনতাও ছত্রভঙ্গ হয়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে পাকবাহিনী পূণ:রায় আক্রমণ করে। এসময় পাকবাহিনীর ৯জন সৈন্য নিহত হলে তাদের মনোবল ভেঙ্গে যায়। তারা পিছু হটে প্রথমে মৌলভীবাজার, পরে সিলেটের দিকে সরে যায় এবং শেরপুরে গিয়ে ঘাঁটি স্থাপন করে। এর ফলে মৌলভীবাজার কিছুদিনের জন্য শত্র“মুক্ত থাকে। এ সময় মেজর সিআর দত্ত, আহত নায়ক শফিক, কর্ণেল রব, মানিক চৌধুরী ও মেজর নুরুজ্জামান এসে যোগ দেন। তাদের নেতৃত্বে শেরপুর প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু হলে সেখানে মৌলভীবাজারের এক কিশোর আবদুল মুহিত টুটু আহত হন। ২৫দিন মৌলভীবাজার শত্র“মুক্ত থাকার পর আবার তা পাকবাহিনীর দখলে চলে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা ২২ এপ্রিল কুড়মা চা বাগান দিয়ে ভারতে চলে যায়। যাবার সময় মনু সেতু ও সোনালী ব্যাংক ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেয়া হয়। তারপর খন্ড খন্ড যুদ্ধের এক দীর্ঘ সংগ্রাম। ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধের চুড়ান্ত রূপ নিলে ২ ডিসেম্বর রাতে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী যৌথ আক্রমণ করে পাক হানাদার বাহিনীর শমসেরনগর বিমানবন্দর ও চাতলাপুর বিওপির অবস্থানের ওপর। আক্রমণের তীব্রতায় টিকতে না পেরে পাক সেনারা মৌলভীবাজারে পিছু হটে। ফলে ৩ ডিসেম্বর শমসেরনগর এলাকা শত্র“মুক্ত হয়ে যায়। মৌলভীবাজার ছিল পাক সৈন্যদের ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার। মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনী ৪ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার দখলের উদ্দেশ্যে শহর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দুরে কালেঙ্গা নামক স্থানে অবস্থান নেয়। এখানে বড়টিলা নামক স্থানে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে মিত্র বাহিনীর ১২৭ সেনা নিহত হন। ৫ ডিসেম্বর থেকে পাকিস্তানের ঘাটিতে বিমান আক্রমণ শুরু হয়। এই হামলা প্রতিরোধে অক্ষম পাক সৈন্যরা নিরস্ত্র বাঙ্গালীদের খুন জখম করে মৌলভীবাজার থেকে পিছু হটে সিলেটের উদ্দেশ্যে শেরপুরের দিকে পালিয়ে যায়। সেখান থেকে তারা চলে যায় সিলেটে। এর ফলে ৮ ডিসেম্বর পুরো মৌলভীবাজার জেলা পাক হানাদার মুক্ত হয়। সেই যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন আওয়ামীলীগ নেতা মির্জা আজিজ আহমদ বেগ এবং মিত্র বাহিনীর মেজর দায়ান। তারা দেওড়াছড়া চা বাগানের রাস্তা দিয়ে মৌলভীবাজার শহরে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামীলীগ নেতা ও সংসদ সদস্য আজিজুর রহমান তৎকালীন মহকমা প্রশাসকের কার্যালয়ে পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে মৌলভীবাজার মুক্তদিবস ঘোষনা দেন। এর আগে ৩ ডিসেম্বর শমসেরনগর এবং ৬ ডিসেম্বর বড়লেখা, রাজনগর শ্রীমঙ্গল হানাদার মুক্ত হয়।

Share This:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*